Wednesday, December 27, 2017

ফতুয়া দেওয়া খুব সহজ ।

একবার এক নারীর বিয়ে হলো। কিন্তু স্বামীর সাথে কোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্ক হওয়ার আগেই স্বামীটি মারা গেলেন। আবার বিয়ের সময় মাহ্‌র (দেনমোহর)-ও নির্ধারণ করা হয়নি। এই মহিলার মাহ্‌রের কী হবে সেটা নিয়ে লোকজন বেশ ঝামেলায় পড়ে গেলেন।
তারা ‘আবদুল্লাহ ইব্‌ন্‌ মাস‘ঊদের কাছে এলেন ফাতওয়া নিতে। আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট থাকুক। উনি বললেন, “আল্লাহর রাসূলের ﷺ কাছ থেকে চলে আসার পর, আমাকে এর চেয়ে বেশি কঠিন আর কোনো প্রশ্ন করা হয়নি। অন্য কারও কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো।”
একমাস লেগে থাকার পরও যখন সাহাবি ‘আবদুল্লাহ কোনো ফাতওয়া দিলেন না, লোকজন তখন বললেন, "আপনাকে জিজ্ঞেস না করে আমরা অন্য আর কাকে জিজ্ঞেস করব বলেন? এই অঞ্চলে আপনি ‎নবিজির ‎ﷺ সবচেয়ে প্রখ্যাত সাহাবিদের অন্যতম। আপনার মতো আর কেউ নেই এখানে।”
অগত্যা তিনি বললেন, "ঠিক আছে, আমি তোমাদেরকে তার (মহিলার) ব্যাপারে আমার সর্বোত্তম মতামত দেওয়ার চেষ্টা করব। যদি তা সঠিক হয়, তাহলে তা শুধুমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাঁর কোনো শরিক নেই। আর যদি তা ভুল হয়, তাহলে তা আমার ও শয়তানের পক্ষ থেকে। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) তা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকবেন..." এরপর তিনি একটা ফাতওয়া দিলেন।
ইসলাম নিয়ে কিছু বলা, বিশেষ করে ফাতওয়া দেওয়া যদি ডালভাত কাজ হতো তাহলে 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন্‌ মাস‘ঊদের মতো সাহাবি শুরুতেই দিয়ে দিতেন। উনার পিছে একমাস লেগে থাকতে হতো না। কুর'আন-সুন্নাহ, দীনের বুঝ উনার নিশ্চয় কম ছিল না। তবু কত সতর্কতা। ফাতওয়া না দিতে চাওয়ার কত আগ্রহ!
আবার লোকেরা কিন্তু চাইলেই অন্য কারও কাছ থেকে সমাধান নিয়ে নিতে পারতেন। নেননি। তারা একমাস তার পিছে লেগে থেকে ফাতওয়া আদায় করে ছেড়েছেন। বিষয়টাকে যে তারা হালকাভাবে নেননি এতে তারই প্রমাণ পাই।
উপরের হাদীসটি থেকে আমি নিজেকে তো ভবিষ্যতে সামান্যতম ফাতওয়া থেকে ১০০ হাত দূরে রাখবই, আমার দীনি ভাইদেরও বলছি, ফাতওয়া দেওয়ার মতো কাজ থেকে নিজে ১০০ হাত দূরে থাকুন। ভার্সিটির স্টুডেন্ট আর সেলিব্রিটিদের কাছ থেকেও "ফিক্‌হ" শেখা থেকে ১০০ হাত দূরে থাকুন। ‘আলিমদের খুঁজে বের করুন। তাদের পিছে লেগে থাকুন। বিদ্যুতহীন যুগে লোকেরা যদি একমাস লেগে থাকার মতো কষ্ট করতে পারে, অত্যাধুনিক যুগে ইমেল, ফোনের মাধ্যমে কয়েক মাস লেগে থাকতে পারবেন না?
————————————————
হাদীস-সূত্র: আবু দাউদ ও আন নাসা‘ঈসহ অন্যান্যরা সংকলন করেছেন। আল-আলবানি হাদীসটিকে স়াহ়ীহ় বলে মত দিয়েছেন (ইরওয়া আল-গালীল, হাদীস নং ১৯৩৯)

Sunday, July 26, 2015

একবার বিশিষ্ট সাহাবী হযরত জাবের [রা:]

চৌখে পানি আশার কাহিনী পড়ে
দেখুন
একবার বিশিষ্ট সাহাবী হযরত
জাবের [রা:] হযরত রাসূল[সা:]-এর
কাছে আরজ করলেন,ইয়া রাসূলুল্লাহ্ !
দয়া করে এই গোলামের বাড়িতে
দাওয়াত কবুল করে নিন । নবীজী
তাঁর দাওয়াত কবুল করে নিলেন।
জাবের [রা:] খুশীতে আত্মহারা
হয়ে বাড়িতে চলে গেলেন ।
বাড়িতে গিয়ে স্রী
ও পুত্রদের খোশ…খবর দিলেন- আজ
আমাদের ভাগ্য খুলে,গেছে
আল্লাহর নবী দয়া করে আমাদের
বাড়িতে তশরীফ নিবেন । এর চেয়ে
আনন্দের ব্যাপার আমাদের জীবনে
আর কি হতে পারে! তিনি
তাঁদেরকে নিয়ে মহানন্দে
নবীজীকে আপ্যায়ন করার
আয়োজনে লেগে গেলন । বাড়ি-ঘর
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সুন্দরভাবে
সাজালেন । সুগন্ধী দ্রব্য ছিটিয়ে
ঘরকে সুবাসিত করলেন-ঘরে পালিত
খাসীজবাই করলেন। বড় ছেলে
আবদুল্লাহকে নিয়ে খাসী জবাই
করে নিজ হাতে তার চামড়া
ছাড়িয়ে সুন্দর করে মাংস টুকরো
টুকরো করে নিলেন । অত:পর স্রীর
কাছে মাংস নিয়ে বললেন,যত্ন
করে মাংসের টুকরোগুলো ভুনা করে
নাও । স্রীকে এ কথা বলে হযরত
জাবের[রা:] বাড়ী-ঘর তদারক করতে
থাকলেন,কোথাও কোন কাজ বাকী
রয়েগেল কি-না । মাঝে মাঝে
রান্না ঘরে গিয়ে দেখেন-রান্না
আর কতদূর হয়েছে; আবার বাড়ীর
সামনের রাস্তায় গিয়ে দেখেন-
নবীজী আসছেন কি-না । ইতিমধ্যে
হযরত জাবের [রা:]-এর ছোট ছেলে ঘুম
থেকে উঠে খাসী তালাশ করতে
লাগলো । তারা দুই ভাই মিলে
খাসীটিকে আদর-যত্ন করে লালন -
পালন করতো ।বড় ভাই তাকে
জানাল -নবীজীর মেহমানদারী
করার জন্য খাসীটিকে জবাই করা
হয়েছে । ছোট ভাই বায়না ধরলো-
খাসী কিবাবে জবাই করে
আমাকে তা দেখাও । অগত্যা বড়
ভাই ছুরি হাতে করে ঘরের পেছনে
গিয়ে বললো, এখানে খাসী জবাই
করা হয়েছে । ছোট ভাই জানতে
চাইলো,কিভাবে ? বর্ণনা করে
বোঝতে না পেরে অবশেষে বড়
ভাই বললো, তাহলে তুমি মাটিতে
শুয়ে পড় । আমি তোমাকে দেখাই ।
ছোট ভাই মাটিতে শোয়ার পর বড়
ভাই তার গলায় ছুরি চালিয়ে জবাই
করার নমুনা দেখাতে গিয়ে ছোট
ভাইকে সত্যি সত্যি জবাই করে
ফেললো । বড় ভাই যখন দেখলো-ছোট
ভাইয়ের গলা থেকে রক্ত গড়িয়ে
পড়ছে, সে ছটফট করতে করতে এক সময়
নিস্তেজ হয়ে গেছে, তখন বুঝলো
ব্যাপারটি কি ঘটেছে । আতঙ্কিত
হয়ে সে নিকটবর্তী এক খেজুর
গাছের চূড়ায় উঠে আত্মগোপন করে
রইলো। এদিকে হযরত জাবের[রা:]
পুত্রদের খোজে বাড়ীর পেছনে
এসে ছোট ছেলের অবস্হা দেখে
থমকে গেলেন । অত:পর তাকে বুকে
করে স্রীর কাছে গিয়ে
বললেন,তাড়াতড়ি একটি কম্বল
নিয়ে এসো, বাচ্চাটিকে শুইয়ে
দিই । স্রী রক্তমাখা সন্তানের লাশ
দেখে চিৎকার করে কাঁদতে
লাগলেন। কিন্ত স্বামী তাকে
সান্ত্বনা দিয়ে বললো আজ
আমাদের শোক প্রকাশ করার দিন না
আমাদের দুঃখ দেখলে নবীজীও
দুঃখিত হবেন । অতএব,ধৈর্য ধারণ
করো । মুখে হাসি ফুটিয়ে তোল ।
তারপর তাঁরা দু’জনে মিলে ছোট
ছেলেকে কম্বল মুড়ে রান্নঘরের
পেছনে রেখে আসলেন ।স্রী
রান্নার কাজে মন দিলেন । জাবের
[রাঃ] বের হলেন বড় পুত্র আবদুল্লাহর
খোজে । বাড়ীর পেছনে গিয়ে
ছেলের নাম ধরে জোরে হাঁক
দিলেন । গাছের উপর আত্মগোপন
করে বড় ছেলে সব. ঘটনা প্রত্যক্ষ
করছিল,R ভয়ে কাঁপছিল । পিতার
ডাক শুনে ভাবলো, এখন পালাতে
না পারলে আব্বার হাতে ধরা
পড়তে হবে । ধরা পড়লে R রক্ষা
থাকবেনা । পালানোর উদ্দেশ্যে
গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ে
আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে সেও মৃত্যুর কোলে
ঢলে পড়লো । পিতা কাছে গিয়ে
গায়ে হাত দিয়ে দেখেন-
আবদুল্লাহর দেহে প্রাণের স্পন্দন
নেই ! বড় ছেলে কে কোলে তুলে
তিনি বাড়ীর ভিতরে আসলেন ।
স্রীকে বললেন, R একটি কম্বল নিয়ে
আসার জন্যে । বড় ছেলের অবস্হা ।
দেখে মাতা পুনরায় আর্তনাদ করে
উঠলেন । স্বামী তাকে পুনরায়
সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,ধৈর্য্য ধরো
। আজ আমাদের দুঃখ প্রকাশের দিন
না । আজ আমাদের পরম আনন্দের দিন ।
তারপর দু’জনে মিলে বড় ছেলের
লাশও কম্বলে মুড়ে ছোট ছেলের
লাশের পাশে রাখলেন ।স্বামী-
স্রী তদের চোখের পানি মুছে মুখে
হাসি ফুটিয়ে তুলেন । যাঁর ”নূরে”
সমগ্র মাখলুকাত পয়দা,সেই
রাহমাতাল্লিল আলামীনের
সামনে অশ্র্র বিসর্জন দিলে তিনি
দুঃখ পাবেন । তাই আনন্দিত হয়ে
তাঁরা নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত
হয়ে পড়লেন । হযরত জাবের [রাঃ]
বাড়ীর সামনে দাড়িয়ে নবীজীর
আগমনের অপেক্ষা করতে লাগলেন ।
অল্পক্ষণের মধ্যে নবীজীকে উটের
পিঠে করে আসতে দেখা গেলো ।
হযরত জাবের [রাঃ] আনন্দে
আত্মহারা হয়ে দৌড়ে গিয়ে
স্রীকে নবীজীর আগমনের সংবাদ
দিলেন । পুনরায় তিনি দৌড়ে
বাড়ীর সামনে চলে এলেন ।
নবীজীর উটের কাছে গিয়ে
তাঁকে বাড়ী পর্যন্ত এগিয়ে
আনলেন নবীজী জাবের [রাঃ]-এর
ঘরের সামনে উট থামিয়ে তাঁর ডান
পা মোবারক মাটিতে
রাখলেন,বাম পা মোবারক এখনো
নামাতে বাকী । এমন সময় জিব্রাইল
[আঃ] আল্লাহর পক্ষ হতে নির্দেশ
নিয়ে উপস্হিত হয়ে বললেন ইয়া
রাসূলুল্লাহ! আল্লাহ্ আপনাকে
জাবেরের ছেলেদেরকে সংগে
নিয়ে খানা খেহে বলেছেন ।
অতঃপর নবীজী
সাহাবায়েকেরামকে নিয়ে
জাবের [রাঃ]-এর ঘরে তশরীফ
নিলেন ।তাদের সামনে জাবের
রা] দস্তর খানা বিছিয়ে দিলেন
তার স্রী খাবার বেরে দিলেন R
তিনি সেগুলো এনে মেহমানদের
সামনে হাজির করলেন তারপর
তিনি নবীজীকে আরজ করলেন, ইয়া
রাসূলুল্লাহ্! বিস্মল্লাহ্ করুন নবীজী
বললেন, হে জাবের ! তোমার
ছেলেরা কোথায় ? তাদেরকে
ডাক হযরত জাবের [রাঃ] বললেন,
ইয়া হাবীবাল্লাহ! আপনি দয়া করে
খেয়ে নিন ছেলেদেরকে আমি
পরে ডাকবো হযরত রাসূল [সাঃ]
পুনরায় বললেন তোমার ছেলেদের
ডেকে নিয়ে এসো তাদেরকে
সাথে নিয়ে খানা খাবো হযরত
জাবের ও তার স্রী হাত জোড় করে
পুনরায় আরজ করলেন ,ইয়া
রাসূললুল্লাহ ! আপনি খানা খেয়ে
নিন আমরা তাদেরকে ডেকে
দিচ্ছি তখন নবীজী বললেন, হে
জাবের ! এইমাত্র জিব্ররাইল
ফেরেশতা আমাকে আল্লাহর
নির্দেশ জানিয়ে গেলেন ,আমি
যেন তোমার ছেলেদেরকে সাথে
নিয়ে খানা খাই নবীজীর একথা
শুনে হযরত জাবের [রা] ও তার স্রী R
ধৈর্য্য ধারণ করতে পারলেনা ।
তারা হাউমাউ করে কেদে বললেন
ইয়া রাসূলূল্লাহ্! ছেলেদেরকে
কোথায় পাবো ? তারা তো জগতে
বেঁচে নেই নবীজী জানতে
চাইলেন ,তাদের কি হয়েছে ?তখন
তারা নবীজীকে সমস্ত ঘটনা খুলে
বললেন তাদের দুঃখের কাহিনি
শুনে সাহাবায়েকেরামও কাঁদতে
শুরু করলেন ।নবীজীর প্রেমিক হযরত
জাবের[রা] ও তার স্রীর ঘটনা শুনে
অনেকে চিল্লাচিল্লি করে
মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকেন
তারপর নবীজী উঠে দাঁড়িয়ে হযরত
জাবের [রা:]-কে বললেন
,তাদেরকে কোথায় রেখেছো,
সেখানে আমাকে নিয়ে চলো।
*hozrut*জাবের [রা:] নবীজীকে
রান্না ঘরের পেছনে নিয়ে গেলন।
আল্লাহ্র নবী *hozrut* রাসূল [স:]
কম্বলাবৃত দুই ছেলের মৃতদেহের উপর
তাঁর দুই হাত মোবারক রেখে বললেন,
হে জাবেরের ছেলেরা! তোমরা
কি দেখ না, তোমাদের আব্ব-আম্মা
আল্লাহ্র নবীকে কত ভালোবাসেন!
আমি মনে কষ্ট পাবো বলে
তোমাদের কথা তারা আমাকে
জানায়নি । তোমরা শীঘ্রই ওঠ,
তোমাদেরকে সঙে করে আমি
খানা খাবো । এ কথা বলে নবীজী
যখন তাদের. দেহ থেকে কম্বল
সরিয়দিলেন , সংগে সংগে তারা
দু’জনউঠে নবীজীর কদম মোবারক
জড়িয়ে ধরলো । তখন নবীজীর
প্রেমে কেউ সুস্হির ছিলেন না ।
সবাই কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশের
মতো হয়ে গেলন। পরিস্হিতি শান্ত
হলে নবীজী হযরত জাবের [রা:]-এর
দুই ছেলেকে নিয় খানা খেতে
বসলেন ।
সবাইকে বললেন , মাংস খাবার পর
হাড় চিবিয় না খেয়ে তা জমা
করে রাখার জন্যে।
এভাবে সবার খাওয়া শেষ হলে
নবীজী তাঁর পবিত্র হাত মোবারক
*হাড়ের* ওপর রেখে বললেন, ওহে
জাবেরের খাসী! তুমি কি দেখো
না তোমার মনিব আল্লাহ্র নবীকে
কতখানি ভালোবাসেন? তুমি
পুনরায় তোমার মনিবের হয়ে যাও।
নবীজী *a* কথা বলার সাথে সাথে
খাসী জীন্দা হয়ে সামনে
দাঁড়িয়ে গেলো ।

ফেরাউন নমরুদ ও মশা কাহিনী

বাইবেলের বুকস অব জেনেসিস ও বুকস অব ক্রোনিকেলস অনুসারে নমরুদ ছিলেন কুশের পুত্র, হামের পৌত্র (grandson) এবং নূহের প্রোপৌত্র (great-grandson). He proclaims himself a god and is worshiped as such by his subjects. ইহুদি ধর্মপুস্তকগুলো তাকে উপস্থাপন করেছে as a man of power in the earth, and a mighty hunter.
অনেকের মতে নমরুদ অর্থ বিদ্রোহী (Rebel)। তিনি খোদার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। আর আমরা তার সম্পর্কে ইতিহাস ও অন্যান্য ধর্মপুস্তক গুলিতে যা পাই তা এটা প্রমান করার জন্যে যথেষ্ট যে তার শক্তি, ক্ষমতা ও দম্ভের প্রকাশ আকাশ ছুঁয়েছিল- তিনি ঐশ্বরিক শক্তির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নেমেছিলেন। এই আর্টিকেলে আমরা দেখব ঐ প্রতিদ্বন্দ্বীতার ধরণ কেমন ছিল এবং তা কি ধরণের ফলাফল বয়ে নিয়ে এসেছিল।
হিব্রোণে বাসকরার এক পর্যায়ে আল্লাহ ইব্রাহিম(আ:) (Abraham)-কে বললেন, "হে ইব্রাহিম! তুমি নমরুদকে সতর্ক কর তার উপর শাস্তি আসার আগেই।"সুতরাং ইব্রাহিম পুনঃরায় নমরুদের রাজদরবারে উপস্থিত হলেন। ফেরাউন নমরুদ (Pharaoh Nimrod) তাকে চিনতে পেরে বললেন, "হে ইব্রাহিম! কি উপলক্ষ্যে তোমার এ আগমন?"
ইব্রাহিম(আ:) বললেন- "হে নমরুদ! আমি আল্লাহ প্রেরিত রসূল, যিনি এক-যার কোন শরীক নেই, যিনি আরশের অধিপতি।"নমরুদ কখনও আল্লাহর কর্তৃত্ব স্বীকারের পক্ষপাতি ছিলেন না। ইতিপূর্বে তো তিনি এ বিষয়ে ইব্রাহিম(আ:)র সাথে বাদানুবাদেও লিপ্ত হয়েছিলেন সেইসময় যখন ইব্রাহিম(আ:) তাকে সিজদা করতে অস্বীকার করে বলেছিলেন- "আমি সিজদা করি একমাত্র আল্লাহকে, যিনি আমার প্রতিপালক।" এতে অবাক হয়ে নমরুদ জিজ্ঞেস করেছিলেন, "হে ইব্রাহিম, কে তোমার প্রতিপালক?"
এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ-
সে (নমরুদ) ইব্রাহিমের সাথে তার প্রতিপালক সম্পর্কে তর্ক করেছিল, যখন ইব্রাহিম বলল, "আমার প্রতিপালক তিনি, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান।"সে বলল, "আমিও জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটিয়ে থাকি।"ইব্রাহিম বলল, "নিশ্চয় তিনি সূর্য্যকে উদিত করেন পূর্ব দিক থেকে, এবার আপনি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখান।" তখন সে অবিশ্বাসী হতভম্ব হয়ে গেল।(২:২৫৮)
এ কারণেই এসময়ে নমরুদ ইব্রাহিম(আ:)র সাথে পুনরায় তার প্রতিপালক সম্পর্কে বিতর্কে না গিয়ে সরাসরি ফয়সালার পথ বেঁছে নিলেন। আর তাই তিনি বললেন, "হে ইব্রাহিম! দুনিয়ার রাজত্ব তো আমার। শীঘ্রই আকাশের রাজত্বও আমি তোমার আল্লাহর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেব।"
ইব্রাহিম(আ:) বললেন, "হে নমরুদ, কিভাবে আপনি আকাশে পৌঁছিবেন?"
তিনি বললেন, "আমার বিজ্ঞ পরিষদবর্গই এ ব্যাপারে আমাকে পূর্ণপথ বাৎলে দেবে।"
অতঃপর নমরুদ যখন এ ব্যাপারে পরিষদবর্গের পরামর্শ চাইলেন, তখন পরিষদবর্গের একজন হয়ে ইবলিস তাকে পূর্ণ পরামর্শ দিল। সুতরাং নমরুদের হুকুমে চারটি শকুনকে লালন-পালন করা হল। অতঃপর একটি সিন্দুক তৈরী করে শকুন চারটিকে কয়েকদিন অভুক্ত রেখে ঐ সিন্দুকের চার কোনায় বেঁধে দেয়া হল। তারপর সিন্দুকের উপরদিকে শকুনের নাগালের বাইরে কিন্তু দৃষ্টির সীমানায় ঝুলিয়ে দেয়া হল মাংসের টুকরো।
নমরুদ ও তার সেনাপতি প্রস্তুত হয়ে টাওয়ার অব বাবিলের চূঁড়া থেকে সিন্দুকে আরোহণ করলেন। উল্লেখ্য আকাশের রাজত্ব দখলের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে নমরুদ টাওয়ার অব বাবিল (Tower of Babel) নির্মান করেছিলেন। এই টাওয়ার অব বাবিল সম্পর্কে বাইবেলে আছে- "....and a tower, whose top may reach unto heaven....". -(Genesis 11:4) যাহোক, শকুনেরা মাংসের টুকরো খেতে চাইল, আর তাদেরকে নিয়ে সিন্দুকসহ উর্দ্ধপানে উড়ে চলল। এ সম্পর্কে ইহুদি রাব্বানিক সাহিত্য জানায়- Nimrod goes on to try storming Heaven, throwing arrows in person, in a chariot driven by birds. আর তাই বাইবেলেও তার সম্পর্কে বলা হয়েছে-"He was a mighty hunter against the Lord."-(Genesis 10:9)
উর্দ্ধ আকাশে পৌঁছে নমরুদ ও তার সেনাপতি একের পর এক তীর উপরের দিকে নিক্ষেপ করলেন। ঐ সময় আল্লাহ জিব্রাইলকে বললেন, "আমার এই বান্দা যেন নিরাশ না হয়। সুতরাং তার তীরগুলিকে রক্তরঞ্জিত করে ফেরৎ পাঠাও।"
এদিকে সকল তীর নিক্ষেপ শেষে নমরুদ পৃথিবী পৃষ্ঠে ফিরে আসতে চাইল। সেজন্যে শকুনগুলিকে নিম্নগতি করার লক্ষ্যে সিন্দুকের উপরের দিকে ঝুলিয়ে দেয়া মাংস একইভাবে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেয়া হল।
মাটিতে অবতরণের পর নমরুদের রক্ষীরা নিক্ষিপ্ত তীরগুলি কুড়িয়ে আনল। যেগুলো পাওয়া গেল তার সবগুলোই রক্তরঞ্জিত।নমরুদ রক্তমাখা তীরগুলি দেখে সফলতার আনন্দে আত্মহারা হয়ে ইব্রাহিমকে বললেন, "হে ইব্রাহিম! আমি তোমার খোদাকে হত্যা করেছি, তীরে লেগে থাকা রক্তই তার সাক্ষ্য বহন করে।"
এ সম্পর্কে বুক অব জাসের (book of Jasher) জানায়- "...they cast the arrows toward the heavens, and all the arrows fell upon them filled with blood, and when they saw them they said to each other, Surely we have slain all those that are in heaven. -(Jasher, 9:29) "..They thought that they killed God."-(Jasher, 9:30)
ইব্রাহিম(আ:) বললেন, "আমার স্রষ্টা চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী।"
নমরুদ বললেন, "ঠিক আছে, তিনি যদি মারা গিয়ে না থাকেন, তবে তাঁর সৈন্যদলকে একত্রিত করতে বল। আমিও আমার সৈন্যদল ময়দানে সমবেত করছি।"
ইব্রাহিম(আ:) বললেন, "আল্লাহকে ভয় করেন, তিনিই তো আপনাকে রাজ্য ও রাজত্ব দান করেছেন। আর তিনিই পরজগতের প্রতিফলদাতা।"
নমরুদ বললেন, "আমিই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং তোমার আল্লাহ বলে যদি কেউ থাকেন, তবে অবশ্যই তাকে আমার শক্তির মোকাবেলা করতে হবে।"
নমরুদ ষাট লক্ষ সেনা ময়দানে সমবেত করলেন। এদিকে প্রতিপক্ষের কোন দেখা নেই। নমরুদ ইব্রাহিম(আ:)কে ডেকে বললেন, "তোমার প্রতিপালকের সেনাদল কোথায়? তিনি নিশ্চয় আমার শক্তিবল দেখে ভীত হয়ে পশ্চাৎপসারণ করেছেন।"
ইব্রাহিম বললেন, "আমার রব ক্ষমতায় মহান, কোনরূপ ভীতি তাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না, বরং তিনিই তা প্রদর্শণ করে থাকেন। একথা নিশ্চিত যে তার সেনাদল ময়দানে এসে পৌঁছিবেই-আর তা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই।"
নমরুদ সেনাপতিদের বললেন, "যুদ্ধ পতাকা উড়িয়ে দাও, সতর্ক হও, নাকাড়া বাজাও।"
ষাট লক্ষ সেনার শোরগোলে ভূমি প্রকম্পিত হল। ফেরাউন পুনঃরায় ইব্রাহিম(আ:)কে বললেন, "কোথায় তোমার রবের সৈন্যদল?"
ইব্রাহিম(আ:) দূরে আকাশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। দূরে কাল রঙের একটা মেঘ দেখা যাচ্ছে। যখন সেটা কাছে, মাথার উপর চলে এল, লক্ষ লক্ষ মশার গুণ গুণ কলতানে চারিদিক মুখরিত হল।
মশা! ক্ষুদ্র এ প্রাণীটি সন্ত্রাসী, বেপরোয়া। রক্তের নেশায় জীবনের ঝুকি নিয়ে তারা আক্রমণ করে মানুষ, পশুকে। আর এ মশা তো আল্লাহ প্রেরিত, যুদ্ধের নিমিত্ত। কিন্তু নমরুদ এদের ব্যক্তিত্বকে খাটো করে দেখলেন। অবজ্ঞার সূরে বললেন, "এ তো মশা! তুচ্ছ এক প্রাণী, তার উপর নিরস্ত্র। তোমার রবের কি অস্ত্র-ভান্ডার বা মালখানা নেই?"
এখানে বলে রাখা ভাল- অনেকের মতে এগুলো মশা ছিল না, ছিল মশার আকৃতির, আকারে আরও ক্ষুদ্র প্রাণী, মাংসাশী (carnivorous), Gnat.
ইব্রাহিম বললেন, "আমার রবের সেনাবাহিনী সম্পর্কে আপনার কোন ধারণাই নেই। আপনার এই সেনাবাহিনীর জন্যে তিনি এই তুচ্ছ, নিরস্ত্র মশাকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। আর নিরস্ত্র হলেও এরা তাদের যুদ্ধ কৌশল জানে। এখন আপনি শুধু এই বাহিনীর মোকাবেলা করে আপনার শক্তি, সামর্থ্য ও মেধার পরিচয় দিন।"
এদিকে এই মশা বাহিনীর সঙ্গে কিরূপে যুদ্ধ করতে হবে তা ভেবে পাচ্ছিল না নমরুদের সেনারা। এত ক্ষুদ্র প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের পূর্ব কোন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বা ট্রেনিং- কোনটাই নেই। সুতরাং তারা হতভম্ভ হয়ে আদেশের অপেক্ষায় সাঁরিবদ্ধভাবে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল। এই অবসরে প্রতিটি সৈন্যের মাথার উপর একটি করে মশা অবস্থান নিল। অতঃপর কেউ কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই তারা তাদের নাসিকা পথে মস্তিস্কে প্রবেশ করল।তারপর দংশন। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হল। হিতাহিত জ্ঞানশুণ্য হয়ে তীরন্দাজগণ উর্ধ্বে তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। আর পদাতিক সেনারা নিজেদের চতুষ্পার্শ্বে অন্ধের মত তরবারী চালনা শুরু করল। এভাবে একে অপরকে নিজেদের অজান্তেই তারা আহত বা নিহত করে ফেলল।
নমরুদ পালিয়ে প্রাসাদে ফিরে আসছিলেন। এসময় একটি দূর্বল মশা তাকে তাড়া করল। সে কিছুক্ষণ তার শিরোস্ত্রাণের চতুষ্পার্শ্বে কয়েকবার প্রদক্ষিণ শেষে সুড়ুৎ করে তার নাসিকাপথে মস্তিস্কে ঢুকে পড়ল। তারপর ধীরে সুস্থ্যে মগজে দংশন শুরু করল। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়লেন নমরুদ। উন্মাদের ন্যায় প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। একসময় দিশেহারা হয়ে পাদুকা খুলে নিজের মাথায় আঘাত করতে শুরু করলেন তিনি। এতে মশা দংশনে বিরত রইল। তিনি একটু আরাম বোধ করলেন। কিন্তু আঘাত বন্ধ করতেই মশা পুন:রায় দংশন শুরু করল। অবশেষে নমরুদ তার মাথায় মৃদু আঘাত করার জন্যে একজন সার্বক্ষণিক কর্মচারী নিযুক্ত করলেন।
এটা অদ্ভূত ছিল যে, পাদুকা ব্যতিত অন্যকিছুর আঘাতে মশা দংশনে বিরত থাকত না। এসময়ই ইব্রাহিম(আ:) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, "হে নমরুদ! স্বীয় মস্তকে, স্বীয় পাদুকা দ্বারা আঘাতের জন্যে, স্বীয় অর্থেই গোলাম নিযুক্ত করে রাখা জঘণ্য। সুতরাং এখনও সময় আছে আল্লাহকে সর্বশক্তিমান ও অদ্বিতীয় বলে স্বীকার করে নিন। তাতে তিনি আপনার পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং আপনি এই কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি পাবেন।"
নমরুদ মনে করতেন খোদাকে স্বীকার করে নিলে তার ক্ষমতা ও প্রভাব বিলুপ্ত হবে। তাই তিনি উত্তর দিলেন, "হে ইব্রাহিম! আমি যাকে চিনি না, জানি না, তাকে কি প্রকারে সর্বশক্তিমান বলে স্বীকার করব?"
ইব্রাহিম(আ:) দেখলেন এই অবাধ্য মানব সন্তান সম্পূর্ণ সত্যপথ বিচ্যূত। তিনি হতাশ হয়ে ফিরে এলেন।
এদিকে নমরুদের সার্বক্ষণিক দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারী অতিষ্ট হয়ে পড়েছিল। একমুহুর্ত অবসর নেই। সামান্য বিরতিতেই তিরস্কার। একসময় তার মনে এমন বিরক্তি ও ক্রোধের সৃষ্টি হল যে, সে তার হস্তস্থিত পাদুকা দ্বারা নমরুদের মাথায় সজোরে এক আঘাত হানল। ঐ আঘাতেই তার মৃত্যু হল।

Tuesday, April 21, 2015

হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)


সিস্তান রাজ্যের সন্জ্ঞর গ্রামে ৫৩৩ হিজরী ও ১১৩৮ ইংরেজি সালে জন্ম গ্রহন করেন। উনার পিতার নাম গিয়াসুদ্দিন ও মাতার নাম সৈয়দা উম্মুল ওয়ারা।পরে স্বপরিবারে খোরাসান শহরে( বর্তমান আফগানিস্তান) হিজরত করেন।মাত্র ১৫ বৎসর বয়সে বাবা – মা উভয়কেই হারান।
একদিন নিজ জমিতে কাজ করে পরিশ্রান্ত অবস্তায় বিশ্রাম নিছিছলেন।এমন সময় সেখানে এসে উপস্হিত হলেন এক অচেনা আগন্তুক। কিশোর খাজা মইনুদ্দিন তাকে বাগানের কিছু আঙ্গুর এনে আপ্যায়ন করলেন। আগন্তুক ছিলেন আল্লাহর এক অলিআল্লাহ,হজরত ইব্রাহিম কান্দুযী(রঃ)।খুশী হলেন কিশোরের আপ্যায়নে।হাত তুলে দোয়া করলেন অনেকক্ষন।তারপর ঝুলি থেকে বের করলেন এক টুকরো শুকনো রুতি।রুটির একাংশ কিছুক্ষন চিবুলেন তারপর অন্য অংশটুকু মইনুদ্দিনকে খেতে দিলেন।আদেশ পালন করলেন মইনুদ্দি একটু পরেই উছ্ছিষ্ট রুটির প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হতে শুরু করলো।বিস্মিত হলেন ।অন্তরের আছছাদন যেন উবে যাছেছ একে একে।অদ্ভুত এক জ্যোতির্ময় অনুভব এসে ধীরে ধীরে আলোকিত করছে হৃদয়ের সর্বত্র।দরবেশ চলে গেলেন।অন্তরে জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন আল্লাহ প্রেমের
অনন্ত অনল।এই হলো অলিআল্লাহদের তাওয়াজ্জোহ এর ফল। মইনুদ্দিন বাগান ও ভিটে বাড়ি সহ সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে বেরিয়ে পরলেন তিনি
আল্লাহর পথে।
প্রথমেই জাহেরী এলেম শিক্ষার জন্য হাজির হলেন বোখারা,সমরখন্দে।দীর্ঘ দিন সেখানে অবস্হান করে বুৎপত্তি অর্জন করলেন জাহেরী এলমের সমস্ত শাখা প্রশাখায়।হুজুর গরীবে নেওয়াজ পিতার সান্নিধ্যে প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করেন। ৯ বছর বয়সে তরজমাসহ পবিত্র কুরআন শরীফ মুখস্থ করেন। অতঃপর ১৩ বছর পর্যন্ত পিতার সার্বিক তত্ত্বাবধানে কুরআন, হাদিস, ফিকহ্, উসুল, তাফসীর, আরবী সাহিত্য ব্যাকরণ, মানতিক, হিকমত দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে গভীর বুৎপত্তি লাভ করেন। এছাড়াও তিনি প্রখ্যাত হাদিস বেত্তা ইমামুল হারামাইন হযরত আবুল মা’আলী (রহঃ) এর নিকট শরীয়তের বিভিন্ন সুক্ষাতিসুক্ষè বিষয়ে পান্ডিত্য লাভ করেন। সমরকন্দের প্রখ্যাত আলেম হযরত শরফুদ্দীন ও বোখারার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত হুসামুদ্দীন (রহঃ) এর নিকট দীর্ঘ পাঁচ বছর অধ্যয়ন করে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার কৃতিত্বপূর্ণ পূর্ণতা অর্জন করেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) বোখারা থেকে নিশাপুরে আসেন। সেখানে যুগশ্রেষ্ঠ ওলী হযরত ওসমান হারুনী (রহঃ) এর নিকট মুরীদ হন এবং মুর্শীদের খেদমতে ২০ বছর অতিবাহিত করেন। ওলীয়ে কামেল খাজা ওসমান হারুনী (রহঃ) তার শিষ্যের মধ্যে বেলায়েতের ঝলক দেখতে পেয়ে খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) কে খিলাফত প্রদান করেন। খাজায়ে খাজেগান আপন পীর মুর্শিদের অনুমতিক্রমে জ্ঞানী, গুণী, পন্ডিত, দার্শনিকসহ অসংখ্য ওলীর সাথে সাক্ষাত করেন। খাজা বাবা বাগদাদ শরীফে গাউছুল আজম বড়পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহঃ) এর সাহচর্যে ৫৭ দিন অবস্থান করেন। এ সময় গাউসে পাক খাজা বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, ইরাকের দায়িত্ব শায়েক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীকে আর হিন্দুস্থানের দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হলো।
তারপর বেরিয়ে পরলেন বাতেনী ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে।
হাদিস শরীফে উল্লেখ আছে, ”জ্ঞান দুই প্রকার।জবানী ইলম ও বাতেনী ইলম।” (মেশকাত শরীফ)।ইমাম মালিক (রঃ) বলেছেন-”যে ব্যক্তি
বাতেনী জ্ঞান অর্জন করলো কিন্তু ইলমে শরীয়ত শরীয়ত গ্রহন করলো না সে নিশ্চিত কাফের ,আর যে ব্যক্তি শুধু ইলমে শরীয়ত গ্রহন করল কিন্তু
বাতেনী ইলম গ্রহন করলো না সে নিশ্চয় ফাছেক”।আর জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মোসলমানের উপর যেহেতু ফরয তাই বাতেনী এলেম অর্জন করাও
ফরয।এই বাতেনী জ্ঞান অর্জনের জন্য আবার খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) বের হয়ে গেলেন বাতেনী জ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষক অন্যেশনের উদ্দেশ্য।
৫৫০ হিজরি সাল।বাগদাদে এসে সাক্ষাৎ পেলেন হজরত বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ) এর।কয়েক মাস উনার সাথে অবস্হানের
পর আবার নুতন শিক্ষকের সন্ধানে বের হলেন।বিদায়ের সময় বড়পীর(রঃ) বললেন,’হে মইনুদ্দিন ।তুমি যখন হিন্দুস্হানে সফর করবে ,তখন পথে পরবে ভাতীসা রমন্ত নামে এক স্হান।সে স্হানে আছে সিংহতুল্য এক মর্দে মুমিন।তার কথা মনে রেখ তুমি।’
শুরু হল নুতন শয়েখের সন্ধান।পথে বিভিন্ন অলির সাথে সাক্ষাতের পর এসে উপস্হিত হলেন খোরাসান এবং ইরাকের মধ্যবর্তী নিশাপুর অন্চলের হারুন নগরে। এই শহরেই বসবাস করেন আউলিয়া সম্প্রদায়েরমস্তকের মুকুট হজরত ওসমান হারুনী(রঃ)।উনার নিকট বায়াত হবার দরখাস্ত পেশ করলে মন্জুর হল।উনার সাথে বিশ বৎসরের অধিক সময় অতিবাহিত করে কামালিয়াতের সর্বোচ্চ স্তরে পৌছলেন।
এবার দাওয়াতের পালা।অলী আল্লাহগন হলেন নবী রাসুলদের প্রকৃত উত্তরসুরী।সেই দায়িত্বের ভার এসে পড়ল খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর উপর।ইতিমধ্যে নুতন এক ছাত্র এসে হাজির হয়েছে খাজার দরবারে।
খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) ছাত্র জনাব কুতুবুদ্দিন বখতিকে সাথে নিয়ে হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন মক্কায়।হজ্ব পর্ব শেষ করে মদীনা শরীফ এসে হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) রসুলে পাক(সাঃ) এর কাছ থেকে এক অবিস্মরনীয় সুসমাচার।হযরত রসুলে পাক(সাঃ) জ্যোতির্ময় চেহারায় আবির্ভুত হয়ে জানালেন,”প্রিয় মইনুদ্দিন।তুমি আমার ধর্মের মইন(সাহায্যকারী)।আমি তোমাকে হিন্দুস্হানের বেলায়েত প্রদান করলাম।হিন্দুস্হান বুৎপরোস্তির অন্দ্ধকারে নিমজ্জিত।তুমি আজমীরে যও।সেখানে তোমর মধ্যমে পবিত্র ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
সুসমাচার শুনে পরিপৃপ্ত হলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)।
পরক্ষনেই চিন্তিত হলেন তিনি।কোথায় আজমির? বিশাল হিন্দুস্হানের কোন দেশে আছে রসূল নির্দেশিত আজমীর?
চিন্তিত অবস্হায় তন্দ্রাছ্ছন্ন হয়ে পরেছিলেন খাজা খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)।সেই অবস্হায় তিনি দেখলেন,হজরত মোহাম্মদ(সাঃ) তার শিয়রে উপবিষ্ট।তিনি তাকে আজমীর শহরের দৃশ্য দেখিয়ে দিলেন।সেই সঙ্গে দিয়ে দিলেন প্রয়োজনীয় পথ নির্দেশনা।এরপর দয়াল নবী (সাঃ) তার হাতে দিলেন একটি সুমিষ্ট আনার।তারপর তার জন্য দোয়ায়ে খায়ের করে যাত্রা শুরু করবার নির্দেশ দিয়ে দিলেন।
সফর শুরু হলো আবার।সঙ্গে সাথী কুতুবুদ্দিন।চলতে চলতে এসে পৌছলেন লাহোর।মনে পড়ে গেল হজরত বড়পীর(রঃ) এর সেই মুল্যবান উপদেশ – মর্দেমুমিন সেই সিংহ পুরুষ এর কথা,সেই ভাতীসা রমস্হ জায়গার কথা। হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) জানতে পারলেন এই লাহোরেই আছে সেই সিংহতুল্য মর্দে মুমিনের মাজার শরীফ।তার মোবারক নাম হজরত দাতাগন্জ্ঞে বখশ(রঃ)।তিনি একাধারে দুই মাস অবস্হান করলেন।তারপর শুরু হল যাত্রা।
এবারের যাত্রার গন্তব্য দিল্লী।
এগিয়ে চলল হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর বেহেশতীকাফেলা।এখন আর কাফেলা দুইজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।বিভিন্ন স্হানে
বিরতির সময় সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কিছু খাটি আল্লাহ অনুরক্ত ফকির দরবেশ।আস্তে আস্তে এর সংখ্যা এসে দারিয়েছে চল্লিশে।সঙ্গী সাথী সহ
দিল্লী এসে উপস্হিত হলেন হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)।দিল্লীর শাসক তখন হিন্দুরাজা খান্ডরাও।আজমীর অধিপতি পৃথ্বিরাজের ভাই ছিলেন তিনি।পৃথ্বিরাজই তাকে তার প্রতনিধি হিসেবে দিল্লীর শাসনভারঅর্পন করেছিলেন।
রাজমহলের অদুরেই নির্মিত হলো ফকির দরবেশদের ডেরা।নির্ভয়ে তরা শুরু করলেন তাদের নিয়মিত ইবাদত বন্দগী।ক্রমে ক্রমে ইসলামের আলো প্রসারিত হতে থাকলো।দিল্লীর আধ্যাতিক দৈন্যতায় এলো ইমানের জ্যোতির্ময় জোয়ার।পিতৃ ধর্ম ত্যাগ করে দলে দলে লোক এসে প্রবেশ
করতে থাকলো আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম ইসলামের সুবাসিত কাননে।বিরোধিতা যেমন বাড়তে লগলো।তামনি বাড়তে থকলো বিজয়ের বিরতিহীন অভিঘাত।কিন্তু গন্তব্যত এখানে নয় ।এগিয়ে যেতে হবে আরো সন্মুখে।রসুল পাক(সাঃ) এর নির্দেশিত সেই আজমীরের আকর্ষন একসময় উদ্বেলিত করে তুললো খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)
এর অন্তরকে।দিল্লীর কুতুব হিসেবে নির্বাচিত করলেন হযরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী(রঃ) কে।দিল্লীর দ্বীন প্রচার ও নওমুসলিমের বিড়াট কাফেলার হেফাজতের দায়িত্ব হযরত কাকির উপর।
খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) তার আত্নোৎসর্গকারী ফকির দরবেশদের নিয়ে রওয়ানা হলেন আজমীর অভিমুখে।পিছনে পরে থাকলো দিল্লী,দিল্লীর শোকাকুল জনতা ও দিল্লীর নব নিযুক্ত কুতুব হযরত বখতিয়ার কাকী(রঃ)।
আজমীর শহরের উপকন্ঠে এসে উপস্হিত হলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) ।সফর সঙ্গীগন সবাই পরিশ্রান্ত।বিশ্রামের ব্যবস্হা করতেই হয়।এই সেই হিন্দুস্হানের বেলায়াতের প্রতিশ্রুত কেন্দ্রভুমি আজমীর ।চারিদিকে পাহাড়,পাথর মরুভুমি।নিকটেই বৃক্ষছায়া।এখানেই বিশ্রামের জন্য উপবেশন করলেন দরবেশদের কাফেলা।
স্হানটি ছিল রাজা পৃথ্বিরাজের উষ্ঠ্র বাহিনির বিশ্রামস্হল। রাজার লোকেরা কিছুক্ষন যেতে না যেতেই সবাইকে স্হান ত্যাগ করতে বলল।বিস্মিত হলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) ।উটের দলতো এসে পৌছবে সেই সন্দ্ধাবেলায়।অথচ লোকগুলি তাদেরকে এখনই তাড়িয়ে দিতে চায়।তিনি বললেন, ”ঠিক আছে আমরা চললাম।তোমাদের উটই এখানে বসে বসে বিশ্রাম করুক।”
পরিশ্রান্ত কাফেলা আবার এগিয়ে চললো সামনের দিকে।।অদুরে ‘আনা সাগর’। সাগরতো নয় একটি বিশাল হ্রদ।লোকে বলে আনা সাগর।আনা সাগরের পাড় ঘেষে অজস্র মন্দির। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এই হ্রদেরই এক ছোট টিলার উপর বসবাসের স্হান নির্বাচন করলেন।সে রাতেই মুখে মুখে আগন্তুক দরবেশের আগমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র।সকালে মহা রাজ পৃথ্বিরাজও শুনতে পেলেন এক অদ্ভুত সংবাদ।উষ্ঠশালার কর্মচারীগন এসে জানালো।গতকাল সন্দ্ধায় যে উটগুলি উষ্ঠ্রশালায় আনাহয়েছিল সবগুলি এখনও শুয়ে আছে।কিছুতেই উঠবার নাম করছে না।সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান দরবেশদলের ঘতনাও বর্নীত হলো রাজার কাছে।দরবেশদলের নেতা উষ্ঠ্রশালা পরিত্যাগের সময় বলেছিলেন , ”তোমাদের উটই এখনে বসে বসে বিশ্রাম করুক।”
ইতিপুর্বে বিক্ষিপ্তভাবে মুসলমান ফকিরদের সম্পর্কে এরকম অনেক কথা রাজার কর্নগোচর হয়েছিল।চিন্তিত হয়ে পড়লেন রাজা পৃথ্বিরাজ।মনে পড়ে গেল তার রাজমাতার ভবিষ্যতবানীর কথা।তিনি বলেছিলেন ”এক মুসলমান ফকিরের অভিসম্পাদেই পৃথ্বিরাজের রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।”
একি তবে সেই ফকির ? সম্ভবত এই ফকিরের কথাতেই এই অবস্হার সৃষ্টি হয়েছে।কর্মচারীদেরকে ফকিরদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার
জন্য নির্দেশ দিলেন রাজা। রাজ আদেশ পালন করল শ্রমিকেরা ।
হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) বললেন যাও।এ অবস্হা আর থাকবে না।উটশালায় ফিরে এসে বিশ্বয়ের সঙ্গে সবাই লক্ষ্য করল উটগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচল শুরু করেছে।ফকিরের কারামতি দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।ধীরে ধীরে আজমীরের অবস্হান্তর ঘটতে লাগলো।কৌতুহল নিবারনের জন্য লোকজন যাতায়াত শুরু করে দিল হযরত খাজার আস্তানায়।তার পবিত্র চেহারা আর তার সাথীদের প্রানখোলা মধুর চরিত্রের প্রভাবে সম্মোহিত হতে লাগলো আজমিরবাসী। হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর সোহবতের(সাক্ষাৎ) বরকতে তাদের অন্তরের অন্দ্ধকার দুর হতে লাগলো।জেগে উঠলো আজমেরীর সত্যান্বেষী জনতা।কিন্তু আতংকিত হলো পুরোহিতরা,শোষক বর্নবাদী হিন্দু সমাজ।ভীত হলো হিংস্র রাজপুরুষগন এবং সামনতবাদী সম্রাট।
ইসলাম বিদ্বেসী ক্রোধান্দ্ধ শহর লোকজন রাজদরবারে গিয়ে হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) ও তার সহচরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো।
অভিযোগ শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন রাজা পৃথ্বিরাজ।অহংকারের নীচে চাপা পরে গেল মায়ের সদুপদেশবানী।রাজা একদল সৈন্যকে আদেশ দিলেন ফকির দরবেশদলকে এক্ষনি রাজ্য থেকে বিতাড়িত করতে। রাজার আদেশ পেয়ে ঝাপিয়ে পরলো অভিযানে। হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) নির্বিকার।আল্লাহ পাকের সাহায্য কামনা করলেন তিনি।সাথে সাথেই আক্রমনকারীদের কেউ হলেন অন্ধ,কারও শরীর হল নিঃসাড়।কেউ হলো ভুতলশায়ী।
নিরুপায় হয়ে পায়ে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলো তারা।দয়ার সাগর গরীবে নেওয়াজ হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) ক্ষমা করে দিলেন সবাইকে।
রাজা পৃথ্বিরাজ ভেবে কুল পান না কি করবেন তিনি।সমরাস্ত্র, সুসজ্জিত সৈন্যদল কোন কিছুই যে আর কাজে আসছে না।এক দুরাগত যবন ফকিরের নিকট পরাজয় বরন করতে হবে তাকে ?ঐশ্বরিক ক্ষমতাধর এই ফকিরের আনুগত্য স্বীকার করবেন নাকি তাকে বিতাড়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। এ কি বিশ্বয়কর সংকট।চুপ করে থাকলেও বিপদ ।বিরুদ্ধাচরন করলেও সমস্যা।এদিকে দলে দলে লোকজন গ্রহন করছে ফকিরের প্রচারিত একত্ববাদী ধর্মমত।
রাজা ভেবে চিন্তে ঠিক করলেন ,হিন্দু ধর্মের আধ্যাধিক সিদ্ধপুরুষদের দ্বারা প্রতিরোধ করতে হবে ফকিরকে।তাই সিদ্ধপুরুষ বলে খ্যাত ”রামদেও” কে অনুরোধ করলেন তার যোগমন্ত্র বলে এই যবন ফকিরকে বিতাড়িত করতে।রামদেও রাজী হলেন।তার ধীর্ঘ সাধনালব্দ্ধ আধ্যাধিক শক্তিতে হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) কে পরাস্ত করার বাসনায় হাজির হলেন হযরতের দরবারে।
হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) তখন ছিলেন ধ্যানমগ্ন অবস্হায়।কিছুক্ষন পর চোখ খুললেন হযরত।দৃষ্টিপাত করলেন রামদেও খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর জ্যোতির্ময় চেহারার দিকে।মুগ্ধ হয়ে গেলেন রামদেও।তার আধ্যাতিক শক্তি মুহুর্তের মধ্যে নিশ্চিন্ন হয়ে গেল।অন্ধকারে আলো জ্বললে মুহুর্তেই যেমন করে অন্ধকার অপসারিত হয়।হজরত খাজার কদম মোবারকে লুতিয়ে পড়লেন রামদেও।নির্দ্বধায় স্বীকার করলেন ইসলাম। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) তার নাম রাখলেন মোহাম্মদ সাদী।
রামদেও এর ইসলাম গ্রহনের সংবাদ শুনে রাজা ক্ষোভে দঃখে অস্হির হয়ে উঠলেন।কিন্তু বিদূষী মায়ের উপর্যুপরি উপদেশের বাধ্য হয়ে সংযত হলেন রাজা।কিন্তু কিছুদিন পরই দেখা দিল আরেক বিপদ।
আনা সগরের পানি শুধুমাত্র উচ্চ বর্নের হিন্দু এবং পুরোহিত সম্প্রদায়
ছারা অন্য কেও ব্যবহার করতে পারতো না।নিম্ন বর্নের হি্ন্দুরা এটা তাদের ধর্মীয় বিধান বলে মনে করত।কিন্তু মোসলমানরা কি আর বর্নভেদের ধার ধারে ? একদিন আনাল সাগরে অজু করতে গেলন হজরত খাজার একজন সাগরেদ।পুরোহিতরা অপমান করে তাড়িয়ে দিলো তাকে।সাগরেদ সমস্ত ঘটনা বর্ননা করলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) কে।হযরত খাজা মোহাম্মদ সাদীকে ”আনা সাগর” থেকে এক ঘটি পানি আনার নির্দেশ দিলেন।নির্দেশ মত মোহাম্মদ সাদী ‘আনা সাগর’ থেকে এক ঘটি পানি আনতেই দেখা গেলো এক আশ্চর্য দৃশ্য।কোথায় সাগর ? সব পানি তার শুকিয়ে গিয়েছে একেবারে।
এই আলৌকিক ঘটনা রাজাকে জানালো প্রজারা।বিব্রত বোধ করলো রাজা।রাজা বাধ্য হয়ে আবারও তাদের প্রজাদের দুর্ব্যবহারের জন্য ফকিরের কাছে ক্ষমা চাইতে নির্দেশ দিলেন রাজা।প্রমাদ গুনলেন পুরোহিত সম্প্রদায়।কিন্তু উপায়ন্তর না দেখে তারা খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর কাছে গিয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করলেন ।
মানুষের দুর্দশা দেখে ও পুরোহিতদের ক্ষমার প্রেক্ষিতে মোহাম্মদ সাদীকে পুনরায় ঘটিতে ভরা পানি আনা সাগরে ঢেলে দিতে নির্দেশ দিলেন।নির্দেশ পালিত হলো।ঘটির পানি ঢেলে দেয়ার সাথে সাথেই ভরে গেল বিশাল হ্রদ ‘আনাল সাগর’।এই আলৌকিক ঘটনার পর বহুলোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিল খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)এর হাত ধরে।
পৃথ্বিরাজ ভেবে পান না কি করে এ মোসলমান ফকিরকে প্রতিহত করা যায় ।কেউ কেউ রাজাকে বুদ্ধি দিলেন বিখ্যাত ঐন্দ্রজালিক অজয় পালকে দিয়ে কিছু করা যায় কিনা ?রাজা তাকেই ডেকে পাঠালেন এবং রাজকীয় পুরুস্কারের প্রস্তাব করলেন।অজয় পাল তার সর্বশক্তি দিয়ে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) কে ঘায়েল করার চেষ্টা করলেন।কিন্তু মিথ্যা কি কখনো সত্যকে প্রতিহত করতে পারে ? অজয় পালও তার ভুল বুঝতে পেরে তার সঙ্গী সাথী সহ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করলেন।খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) অজয় পালের নাম রাখলেন ‘আব্দুল্লাহ বিয়াবানী’।
সংবাদ শুনে মুষড়ে পরলেন রাজা।নিজ রাজ্য রক্ষার কথা চিন্তা করে সংঘর্ষমুক্ত সহাবস্হানের পথ অবলম্বন করলেন রাজা।কিন্তু সত্য মিথার সংষর্ষ যে অবসম্ভাবী।আবারও সংঘর্ষের সূত্রপাত হলো এভাবে-
রাজদরবারের একজন কর্মচারী ছিলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর একান্ত অনুরক্ত।মুসলমানও হয়ে গিয়েসিলেন তিনি।রাজা একথা জেনেও তাকে খুব পছন্দ করতেন তার উত্তম স্বভাব,বিশ্বস্হতা ও সততার জন্য।কিন্তু রাজদরবারের অন্যান্য সদস্যদের প্ররোচনায় এক সময় সেই কর্মচারীর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন রাজা। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর কাছে বার বার হেনস্ত হবার সমস্ত ক্ষোভ যেন গিয়ে পড়লো তার উপর।মুসলমান কর্মচারী সমস্ত দুঃখের কথা খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর কাছে বর্ননা করার পর খাজাকে অনুরোধ করলেন তার জন্য রাজার কাছে একটি সুপারিশ পত্র পাঠাতে।পর দুঃখে কাতর খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) একান্ত বিনয় ও নম্রতার মাধ্যমে সেই কর্মচারীর পক্ষে একটি সুপারিশ পত্র পাঠালেন।সেই সঙ্গে রাজাকে জানালেন ইসলাম গ্রহনের একান্ত আহ্বান।
চিঠি পেয়ে রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন পৃথ্বিরাজ।মুসলমান কর্মচারীকে চকুরীচ্যুত করলেন রাজা।সেই সঙ্গে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর বিরুদ্ধে উচ্চারন করলেন অশালীন বক্তব্য।সংবাদ শুনে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর প্রেমময় অন্টরেও প্রজ্জলিত হলো রুদ্ররোষের সর্বধ্বংসী আগুন।তিনি একটুকরা কাগজে লিখে পাঠালেন রাজা পৃথ্বিরাজকে-”মান তোরা যেন্দা বদস্তে লশকরে ইসলাম বছোপর্দম”। অর্থাৎ আমি তোমাকে তোমার জীবিতাবস্হাতেই মুসলিম সেনাদের হাতে সোদর্প করলাম।এর পরেই স্বপ্ন দেখলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী এবং উনার নেতৃত্বেই হিন্দুস্হানে উরলো মোসলমানদের বিজয় পতাকা এবং পতন হলো মহারাজা পৃথ্বিরাজের।
নিদ্রাভিবুত ছিলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী।স্বপ্নে দেখলেন শ্বেত শুভ্র বস্ত্রাবৃত এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ সিংহাসনে বসা।তার সামনে দন্ডায়মান অনেক অনুচর।তাদের মধ্যে একজন সুলতান ঘোরীকে হাত ধরে একদল সুসজ্জিত মুসলমান সেনাদলের নিকট নিয়ে গেল।আর সেই সময় সেই জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ তাকে লক্ষ্য করে বললেন,”যাও তোমাকে আমি হিন্দুস্হানের শাসন ক্ষমতা দান করলাম।”।
স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল।চমকিত হলেন সুলতান।এ নিশ্চয়ই শুভ স্বপ্ন হবে। সকালে ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে স্বপ্নের বৃত্তান্ত জানালেন।সবাই একবাক্যে বললেন ,মনে হয় অচিরেই হিন্দুস্হান আপনার করতলগত হবে।এ স্বপ্ন তারই আগাম সুসংবাদ।
সুলতান মনস্হির করলেন হিন্দুস্হান অভিযান শুরু করার। সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেককে প্রস্তুত হবার নির্দেশ দিলেন।৫৮৮ হিজরি সালে সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে হিন্দুস্হান অভিমুখে রওয়ানা হলেন।অন্তরে বিগত যুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি।সে গ্লানি এবার মুছতেই হবে।ইতি পুর্বে দুই দুইবার হিন্দুস্হান আক্রমন করেও সফল হতে পারেন নি।শুরু হল তুমুল যুদ্ধ। সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরীর সৈন্যসংখ্যা রাজা পৃথ্বিরাজের সৈন্যের তুলনায় একেরারেই কম।কিন্তু ইমানের বলে বলীয়ান এক আল্লাহর একছ্ছত্র শক্তির প্রতি নির্ভর করে তারা নির্ভয়ে এগিয়ে চললো। এই বাহিনীর প্রধান সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেক।তারায়েনা প্রান্তরে দুই বাহিনীর মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হলো। মুসলমানদের প্রচন্ড আক্রমনের সামনে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল পৌত্তলিক সৈন্যবাহিনী।নাস্তানাবুদ হয়ে পালিয়েও নিস্তার পেল না তারা।ক্ষিপ্রগতিতে রাজপুত সৈন্যদের পশ্চাদ্ধাবন করে যাকে যেভাবে পাওয়া গেল,তাকে সেভাবেই হত্যা করতে লাগলো মুসলমান সৈন্য বাহিনী।উপায়ন্তর না দেখে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেলো সেনাপতি খান্ডে রাও।রাজা পৃথ্বিরাজও সরস্বতী নদীর তীর ধরে পালাবার চেস্টা করার সময় মোসলমানদের সৈন্যদের হাতে বন্দী হয়ে গেল রাজা।শেষাবধি হত্যা করা হল তাকে।৫৮৮ হিজরী সালে ভয়াবহ এ যুদ্ধে সুলতান সাহাবুদ্দিন ঘোরী নিরংকুশ বিজয় লাভ করলেন।আরো সামনে এগিয়ে চললো ঘোরী বাহিনী।এর পর সহজেই এক এক করে সরস্বতী,সামানা ও হাশিসহ অধিকৃত হল দিল্লী।সুলতান দিল্লীর দায়িত্ব দিলেন কুতুবুদ্দিন আইবেককে ।তারপর সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী এগিয়ে চললেন আজমীরের দিকে।
তার এই এই অপ্রতিরুদ্ধ অগ্রাভিযানের সামনে অবনত হলো যুদ্ধে নিহত হিন্দু রাজাদের পুত্রগন।দেউল নামক স্হানে সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাত করলো অনেক রাজপুত্রগন।মুসলিম শাসনের প্রতি তাদের আনুগত্যের বিনিময়ে সম্রাট তাদেরকে দান করলেন বিভিন্ন রাজ্যের জায়গী। সুলতান এগিয়ে চললেন আজমীরের দিকে।
এদিকে আজমীরে ক্রমাগত বেড়েই চলছে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর কাফেলা। ইসলাম কবুলকারীদের সংখ্যা এখন লক্ষ লক্ষ।শুধু আজমীরে নয় এখন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর জামাত এখন ছড়িয়ে পরেছে হিন্দুস্হানের কোনায় কোনায়।দর্শনার্থীদের ভীর সব সময় লেগেই থাকে।
সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী অবশেষে আজমীর এসে পৌছলেন।তখন সন্ধা হয় হয়।সুর্যাস্ত হওয়ার পর সচকিত হয়ে উঠলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী।দুরে কোথায় আজানের ধ্বনি শোনা যায়।সেদিকে এগিয়ে যেতেই তিনি দেখলেন একদল নুরানী জান্নাতী
লোক হাত বেধে দাড়িয়েছেন।দরবেশদের জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করলেন সুলতান।সালাত শেষে জামাতের ইমামের মুখের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী।এইতো সেই জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ,স্বপ্নে যিনি জানিয়েছেন হিন্দুস্হান বিজয়ের সুসংবাদ।
সুলতান শ্রদ্ধাভরে পরিচিত হলেন হজরত খাজার সাথে।তিনদিন হযরতের মোবরক সহবতে অতিবাহিত করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন সুলতান।তার প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লীতে রেখে গেলেন কুতুবুদ্দিন আইবেক কে।তিনিও বায়াত গ্রহন করলেন খাজার প্রতিনিধি খাজা বখতিয়ার কাকী(রঃ) হাতে।এর পর রাজনৈতিক ও রুহানী শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পৌত্তলিকতা উছ্ছেদের অভিযান চলতে থাকলো সমান্তরাল গতিতে।কুতুবুদ্দিন আইবেক ক্রমে ক্রমে প্রসারিত করলেন মুসলিম রাজ্যের সীমানা।কনৌজ,বানারস সহ আরো বহু স্হানে উড়িয়ে দিলেন মোসলমানদের বিজয় পতাকা।

Saturday, April 18, 2015

ইলমে গায়েব নবী করীমের(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার) নবুয়তের অন্যতম দলীল


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় সুহৃদ
আসসালামু আলাইকুম
ইলমে গায়ব বিষয়ে আনেক তর্ক বিতর্ক হয়েছে , সে কারনে এই বিষয়ে কোরআন শরীফ থেকে ও সহীহ বুখারী শরিফ ও ( মুত্তাফাকুল আলাই )হাদিস নি্যে মুল পোস্ট টি সাজানো হয়েছে । যারা জানতে চান কেবল তাদের জন্য । আর যারা সত্য জানবেন কিন্তূ কশ্চিম কালেও মেনে নিবেন না কোরআন হোক আর সহীহ হাদিস হোক নবীজি কে ছোট করা যাদের ধর্মে পরিনত হয়েছে কোরআন বা হাদীস কোন বিষয় নয় তাদের ব্যাপারে আমার কিছু বলার নাই । আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট ।
হযরত আমর ইবনে আখতাব (রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) হতে বর্নিত , তিনি বলেন , আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) একদিন আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামাজ পড়লেন । অতঃপর মিম্বরে আরোহন করলেন এবং আমাদের উদ্দেশে দীর্ঘ বক্তব্য প্রদান করলেন ; এমন কি যোহরের নামায পড়ালেন ।অতঃপর আবারো আরোহন করলেন মিম্বরে , আর বক্তব্য দেওয়া শুরু করলেন ,এমন কি আসরের নামাযের সময় উপস্থিত হল । অতঃপর মিম্বরে হতে নেমে আসরও পড়লেন । পুনরায় মিম্বরে আরোহন করে বক্তব্য দিতে দিতএ সুর্য অস্তমিত হয়ে গেল । সে দিন নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) অতীতে যা কিছু এবং ভবিষ্যতে যা কিছু হবে সকল বিষয়ে আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন । আমাদের মধ্যে যাঁদের স্মরণশক্তি অধিক তাঁরা সেসব (অদৃশ্য) সংবাদ বেশী মনে রাখতে পেরেছেন ।
( সুত্র : বুখারী শরীফ হাদিস নম্বর ৬২৩০ কিতাবুল কদর , মুসলিম শরিফ হাদিস নম্বর ২৮৯১ কিতাবুল ফিতান , তোরমিযী শরীফ হাদিস নম্বর ২১৯১ কিতাবুল ফিতান , আবু দাউদ শরীফ হাদিস নম্বর ৪২৮ কিতাবুল ফিতাম , মিসকাতুল মাসাবিহ : কিটাবুল ফিটাম ৪৬১ পৃষ্ঠা )
প্রসঙ্গিক আলোচনা
মহান রাব্বুল আলামীন পৃথিবীর বুকে মানবজাতির হিদায়াতের জন্য যত নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন সবাইকে তাঁদের নুবুয়তের দলিল হিসাবে কতিপয় মু’জিযাও দান করেছেন ।
অন্যান্য নবীগনের ক্ষেত্রে ঐসব মু’জিযার সীমিত থাকলেও আমাদের প্রিয় রাসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা)-এর ব্যাপার ছিল সম্পুর্ন ভিন্ন । অন্য নবীগনের যাবতীয় মু’জিযা একত্রিত করলে যা হয় তাঁর সবক’টি তো বটে; বরং এরপরেও আরো কত মু’জিযা দান করেছেন তা গণনা করা যাবে এমন হিসেবের খাতা নীল আকাশের নিচে খুজে পাওয়া যাবে না ,গণনা বাইরে যে সব মু’জিযা রয়েছে এর একটি হল ইলমে গায়েব বা “অদৃশ্যজ্ঞান “। এই ইল্‌মে গায়েব মহানবীর অতুলনীয় বৈশিষ্টাবলীর অন্যতম অনুগ্রহ। যেমন কোরআনে পাকে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন।
এই আয়াতের শেষ অংশে ” ওয়া আল্লামাকা মালাম তাকুন তায়’লামু ওয়া কানা ফাদ’লুল্লাহি আলাইকা আযিমা ‘
অর্থাৎ আপনাকে যা জানা ছিল না তিনি(আল্লাহ) আপনাকে সবই শিক্ষা দিয়েছেন এবং তা ছিল আপনার উপর আল্লাহর মহা অনুগ্রহ ।
পবিত্র ক্বোরআনের ভাষায় বলা যায় – নবীপাক(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা)এর জন্য মহান আল্লাহ অজানা কিছুই রাখেন নি ; হোক না তা অতীত কিংবা ভবিষ্যত । কিয়ামত পরবর্তি বেহেশত-দোযখের সংবাদ পর্যন্ত যেখানে লুকায়ে থাকতে পারেনি ।তাই তো তিনি উপস্থিত আনেক লোকের মনের খবর বলে দিয়েছেন , মুনাফিক্বেদের অন্তরে আবৃত অন্ধকার কুঠুরিতে লালিত কপটতা প্রকাশ করে মসজিদ থেকে তাদের অনেককে বের করে দিয়েছেন । এমন কি অনেক সাহাবীর আবেদন পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বংশ তালিকা নিখুঁত ভাবে বলে দিয়েছেন এ গুলো কি প্রমান করে না নবীপাকের ইলমে গায়েব বিতর্কের উর্ধ্ধে একটি স্বীকৃত বিষয় ?
আল্লাহর রাসুলের(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) বাল্যবন্ধু নয় কেবল সারাজীবনের একান্ত সঙ্গী ইসলামের প্রথম খলিফা এবং নবীগনের পর যিনি শ্রেষ্ট মানুষ , সিদ্দিকে আকবর হযরত আবু বকর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহনের প্রাক্কালে নবী করীমের(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) কাছে তাঁর নুবুয়তের পক্ষে দলিল কি আছে ? জানতে চাইলে নবী করীম উত্তর দিতে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলেন নি বরং দু’শ ভাগ দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে বলে দিয়েছিলেন কেন গত রাতে তুমি যে স্বপ্ন দেখেছ , আকাশের চন্দ্র-সুর্য তোমার কোলে এসে হাজির । আর সিরিয়া যাত্রাপথে সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী তোমাকে যা কিছু বলেছে তাইতো আমার নবুয়তের পক্ষে দলিল ।
এমন আশ্চর্যজনক তথ্যপ্রদানের অবস্থা হচ্ছে সিদ্দিক-ই-আকবরের স্তম্ভিত ! তিনি শতভাগ নিশ্চিত হলেন যে , এই অদৃশ্যজ্ঞানের সংবাদদাতা (নবী) কষ্মিণকালেও মিথ্যুক হতে পরেন না ।তিনিই মহান আল্লাহর সত্য নবী । সন্দেহাতীত ভাবে তাঁর নবুয়ত প্রমানিত ।তদ্রুপ হযরত আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)এর কথা শোনা যাক । বদরের যুদ্ধের বন্দিদের কে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ হলে অন্য বন্দীরা যথারীতি মুক্তিপণ আদায়ে ব্যস্ত । এ দিকে চাচা হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও ঐ যুদ্ধবন্দীদের একজন । তিনি ভাতিজার কাছে এসে আবেদন করলেন বাবা ! আমি তো গরিব মানুষ ! মুক্তিপন দেয়ার মত আমার কাছে কোন সম্পদ নেই ।উত্তরে নবী করীম(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা)বললেন ” কেন চাচা ! আপনি যুদ্ধে আসার পুর্বে আমার চাচীর কাছে যে স্বর্নালন্কার লুকিয়ে রেখে এসেছেন সে গুলো কোথায় ? হযরত আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)র সে গোপন সংবাদ তো দুনিয়ার বুকে অন্য কেউ জানার কথা নয় ! কিন্তূ তাঁর ভাতিজা কিভাবে সুস্পস্টভাবে বলে দিলেন । তা রীতিমত বিষ্ময়ের ! না! এ ধরনের অদৃশ্য সংবাদদাতা কোনদিন মিথ্যুক হতে পারেন না । তাঁর কপালও চমকে উঠল । নবীজীর হাতে নিজেকে সঁ’পে দিয়ে বলে উঠলেন হে আল্লাহর রাসুল ! আমাকে ইসলামের কালেমা শরীফ পড়িয়ে মুসলমান বানীয়ে দিন । আমি এতদিন ছিলাম গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। এবার আলোতে আসতে চাই । নবীজি তাঁকে কালেমা পড়িয়ে নিজ হাতে বায়াত করে মুসলমান বানালেন । এ ভাবে একজন জাহান্নামী মুহুর্তে বেহেশতী হয়ে গেলেন । শুধু কি তাই ? নবীর পরশে শ্রেষ্ট সোনার মানুষে রুপান্তরিত হলেন ।
এ ভাবে হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে যদ্বারা স্পস্ট প্রমাণিত হয় -মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীবকে ইলমে গায়েব দান করেছেন ।
এখন আরো কয়েকটি সহীহ হাদীসের উদ্ধৃতি পেশ করব যাতে সহীহ হাদীস ছাড়া অন্য কিছূ মানিনা বলে যারা গলার পানি শুকিয়ে ফেলে তারা বিষয়েটি সহজে বুঝতে পেরে হিদায়াত লাভ করে ।
হযরত ওমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত , তিনি বলেন একদা হুজুর নবী করীম(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) আমাদের সামনে দন্ডায়মান হলেন অতঃপর সৃষ্টিজগতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তথা বেহেশত বাসীরা বেহেশতে এবং দোযখনাসীরা দোযখে প্রবেশ করা পর্যন্ত সবকিছু আমাদের সামনে বলে দিলেন । আমাদের মধ্যে যারা মুখস্ত রাখতে পেরেছে তারা মুখস্ত রেখেছে ; আর যারা ভুলে যাবার তারা ভুলে গেছে ।
[ বুখারী : হাদীস নং ৩০২০ : কিতাবু বাডয়িল খালক্ব ]
হযরত হুযাইফা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্নিত । তিনি বলেন রাসুলে পাক(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) আমাদের সামনে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করলেন- সে দিন থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তার কোন বিষয়েই তাঁর বক্তব্যে বাদ দেননি । শ্রোতাদের মধ্যে যে মুখস্থ রাখার সে মুখস্ত রেখেছে আর যে ভুলে যাবা সে ভুলে গেছে ।
( বুখারী শরীফ হাদীস নং ৬২৩০ কিতাবুল কদর । মুসলিম শরীফ হা:নং২৮৯১ কিতাবুল ফিতন )
হযরত আনাস বিন মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে াপর এক হাদীস শরিফে দেখা যায় । তিনি বলেন একদা নবীপাক(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) আমাদের মাঝে তাশরীফ আনলেন তখন সূর্য পশ্চিমাকাশে দিকে ঝুঁকে পড়েছিল ( অর্থাৎ যোহরের নামাযের সময় হয়ে গিয়েছিল ) অতঃপর নবী করীম(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) যোহরের নামায পড়লেন আর সালাম ফিরানোর পর মিম্বরে আরোহন করে ক্বিয়ামতের আলোচনা রাখলেন এবং ক্বিয়ামতের পুর্বেকার কতিপয় বড় বড় ঘটনা বর্ননা দিলেন আর উপস্থিত সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বললেন , খোদার কসম তোমরা আমার কাছে যা কিছু জানতে চাইবে আমি এই মজলিসেই সব প্রশ্নের উত্তর দেব ।
হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন হুজুরের বানীর এমন দৃঢ়তা দেখে আনসারী সাহাবাদের মধ্যে আনন্দের কান্নার রোল বয়ে গেলো । আর নবীপাক(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা)বারবার বলে যাচ্ছেন – তোমরা আমাকে প্রশ্ন কর , প্রশ্ন কর । অতঃপর এক ব্যক্তি দাড়িয়ে প্রশ্ন করল – হে আল্লাহর রাসুল ! পরকালে আমার ঠিকানা কোথায় হবে ? নবীপাকে বললেন জাহান্নাম । অথপর আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা বললেন -ইয়া রাসুল লাল্লাহ ! আমার পিতা কে ? নবী করীম বললেন – তোমার পিতা হুযাফা । নবীপাক(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) আবার ও জোর তাগিদ দিয়ে বললেন , তোমরা প্রশ্ন কর , প্রশ্ন কর ।
অত:পর,ওমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) নবী করীম(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) বরাবর সামনে গিয়ে বসলেন আর বললেন -আমরা সন্তস্ট যে আল্লাহ কে রব হিসাবে পেয়ে , ইসলাম কে দ্বীন হিসাবে আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) কে রাসুল হিসেবে পেয়েছি । তিনি এসব কথা বলার সময় নবী করীম(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) চুপ রইলেন । অতঃপর বললেন -সেই সত্তার কসম ! যার হাতে আমার প্রাণ , আমার এ দেয়ালের সামনে এই মাত্র বেহেসত ও দোযখ হাজির করা হয়েছে , যখন আমি নামায পড়ছিলাম , আজকের মত কোন ভাল-মন্দকেও দেখিনি ।
(সুত্র বুখারী শরীফ হাদীস নং৬৮৬৪ কিতাবুল ই’তিসাম , বিল কিতাবে ওয়াস সুন্নাহ :, মুসলিম শরীফ হাদিস নং ২৩৫৯ )
এ ভাবে অসংখ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় রাসুলে আকরাম(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) ইলমে গায়েবের অধিকারী ছিলেন । অবশ্যই তা আল্লাহ প্রদত্ত ।
আর সত্তাগত আলিমুল গায়েব হলেন একমাত্র আল্লাহ । আর আল্লাহর রাসুলের ইলমে গায়েব আল্লাহ্‌ প্রদত্ত । যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে -
” মা কানাল্লাহু লি উতলিয়াকুম আলাল গাইবে ওয়ালাকিন নাল্লাহা ইজতাবিয়ু মির রুসুলিহু মাইয়া শায়ু ”
অর্থাৎ হে সাধারাণ লোকগন ! আল্লাহ তা’আলার শান নয় যে , তিনি তোমাদেরকে ইলমে গায়েব দান করবেন , তবে হ্যাঁ রাসুলগনের মধ্য হতে তিনি যাকে চান তাকে অদৃশ্যজ্ঞানের জন্য মনোনীত করেন ।( সুরা আলইমরান ১৭৯)
রসুলগণের মধ্য হতে যদি আল্লাহ পাক কাউকে নির্বাচিত করেন। তাহলে সর্বপ্রথমে কাকে নির্বাচিত করবেন তা সহজেই অনুমেয় ।
আরেক জায়গায় ইরশাদ হয়েছে ;
(আল্লাহ)স্বীয় গায়েবের বিষয়ে কাউকে ক্ষমতাবান করেন না । কিন্তূ রাসুলদের মধ্য যার উপর তিনি সন্তষ্ট হন( তাকেই ক্ষমতাবান করেন )
(সুরা জিন- আয়াত ২৬-২৭ )
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন ‘ আল্লামাকা মা লাম তাকুন তা’লাম ” আর্থাৎ, তিনি আপনাকে এমন জিনিস শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি জানতেন না “
( সুরা নিসা আয়াত ১১৩)
এ আয়াতে ব্যাখা করতে গিয়ে প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ “জালালাইন শরীফে” বলা হয়েছে ” আউযয়ু মিনাল আহকামে ওয়াল গাইব ” অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) কে শরীয়তের যাবতীয় হূকুম ও গায়েব সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন ।
উপরে বর্নিত আয়াত এবনহ জালালাইন শরীফের ব্যাখ্যা দ্বারা বুঝা গেল,
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর হাবীব(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) কে ইলমে গায়েব জানাইয়াছেন । তাই আমরা বলি(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) ইলমে গায়েব জানেন । অসংখ্য হাদিসে মাধ্যমে জানা যায় যে রাসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) স্পস্ট বলে দিয়েছেন -কে কখন মৃত্যুবরন করবে ? কোন জায়গায় কে মারা যাবে এবং কার গর্ভে ছেলে সন্তান অথবা মেয়ে সন্তান রয়েছে ইত্যাদি।
যদি রাসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) এ সব বিষয়ে গায়েব না জানতেন , তাহলে সম্স্ত গয়েবের সংবাদ কি ভাবে দিলেন ?
তাফসীরে সাভার ৪র্থ খন্ডে ২৭৫ পৃষ্টা রয়েছে,
“ইনণাহু(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) লাম ইয়াখ রুজু মিনাদ দুনিয়া হাত্বা আ’লামাহু ল্লাহু বি জামইহি মুগি বাতিদ দুনিয়া ওয়াল আখেরাহ “
অর্থাৎ, আল্লাহর দুনিয়া এবং আখেরাতের সমস্ত গায়েব না জানানো পর্যন্ত রাসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) দুনিয়া থেকে ইন্তেকাল করেন নি ।
তাফসিরে খায়েন ৪র্থ পারায় রয়েছে ;
” মা কানাল্লাহু লি ইয়াজ রাল মু’মিনিনা আলা মা ানতুম আলাইকুম “
উক্ত আয়াতের ব্যখ্যাু উল্লেখ করা হয়েছে – রাসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) এরশাদ করেন , আমার কাছে আমর উম্মতকে তাদের নিজ নিজ মাটির আকৃতিতে পেশ করা হয়েছে যেমন ভাবে আদম (আলাহিস সালাম) এর কাছে পেশ করা হয়েছিল । আমাকে জানানো হয়েছে , কে আমার উপর ঈমান আনবে ? কে আমাকে অস্বিকার করবে ? যখন এ খবর মুনাফিকদের কাছে পোছলো তখন তারা ঠাট্টা করে বললো -কে তাঁর উপর ঈমান আনবে আর কে তাকে অস্বিকার করবে তাদের কে তাদের জন্মের পুর্বেই মুহাম্মদ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) জানতেন বলে বলেন । অথচ আমরা তাঁর সাথেই আছি – কিন্তু আমাদেরকে চিন্তে পারেন নি । এ খবর যখন রাসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) এর নিকট পৌছলো । তখন তিনি মিম্বরের উপরে দাড়ালেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করে ইরশাদ করলেন,
“( কালা মা বালআকওয়ামে তায়ানু ফি ইলমি লা তাসআলু নি আন শাঈন ফিমা বাইনাকুম ওয়া বাইনাস সাআতি ইল্লা আনবাইতুকুম বিহ্‌)
অর্থাৎ, এসব লোকেদের ( মুনাফিকদের) কি যে হলো আমার জ্ঞান নি্যে তারা বিরূপ সমালোচনা করছে । তোমরা এখন থেকে কেয়ামত পর্যন্ত যে কোন বিষয় সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করো আমি অবশ্যই উহা তোমাদের কে বলে দিবো”
(তাফসীরে খায়েন )
বুখারী শরীফের ‘ বাদ্‌য়ু খালকে ” শীর্ষক আলোচনায় ও মিশকাত শরীফের “বাদয়ু খলকে ওয়া জিকরুল আমবিয়া” শীর্ষক অধ্যায়ে হযরত উমর ফারূক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহূ) থেকে বর্নিত অর্থাৎ হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন — ” রাসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) এক জায়গায় আমাদের সাথে অবস্থান করছিলেন । সে খানে তিনি আমাদের সৃষ্টির সূচনা থেকে সংবাদ দিচ্ছিলেন – এমন কি বেহেস্তবাসী দোযখবাসী নিজ নিজ ঠিকানায় যাওয়ার অবধি পরিব্যাপ্ত যাবতীয় আবস্থা ও ঘটনা বলী প্রদান করেন ,যিনি ওসব স্মরণ রাখতে পেরেছেন তিনিতো স্মরণ রেখেছেন ; আর যিনি রাখতে পারেন নি তিনি ভুলে গেছেন । ( মেশকাত শরীফ ৫০৬)
মেশকাত শরিফের “আল-ফিতনা” অধ্যায়ে বুখারী ও মুসলিম শরীফ বরাত দিয়ে হযরত হুযাইফা (রাদিয়াল্লাহ আনহু) থেকে বর্নিত হয়েছে
অনুবাদ : রাসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) সে স্থানে কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে সব কিছুর খবর দিয়েছেন । কোন কিছুই বাদ দেন নাই । যারা মনে রাখার তারা মনে রেখেছেন, আর যারা ভুলে যাওয়ার তারা ভুলে গেছেন ।( মিশকাত শরীফ)
এ সমস্ত হাদীস শরীফের মাধ্যমে জানা গেল রাসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) সৃষ্টির শুরু থেকে কেয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে উহা জানতেন এবং উহার সংবাদ সাহাবাদেরকে দিয়েছেন ।
মুলত গবেষণা করলে দেখা যায় , নবীজীর বরকতময় জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে রয়েছে বিশ্বমানবতার জন্য শিক্ষনীয় বিষয় । আর অধিকাংশ গুরুত্বপুর্ণ কর্মসুচিতে দেখা যায় , ইলমে গায়েবের প্রভাব । পবিত্র ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে সংক্ষেপে এতটুকু আলোচনা করলাম ।
আল্লাহ আমাদের উক্ত আলোচনা থেকে প্রকৃত ইলম জানার ও বোঝার তৌফিক দান করূন – আ-মিন ।
( বিস্তারিত জানার জন্য দেখতে পারেন “জা-আল-হক্ব” : প্রথম খন্ড )

Thursday, April 16, 2015

গায়েবানা জানাযা জায়েয কি না-

গায়েবানা জানাযা জায়েয কি না-
মানুষ মারা গেলে তাকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য জমায়েত এবং তার মাগফিরাতের জন্য যে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় এবং তাতে যে বিশেষ পদ্ধতিতে নামায পড়া হয়, তার নাম জানাযা। অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও অনাড়ম্বর পরিবেশে এই জানাযার নামায আদায় করা হয়ে থাকে। মৃতের মাগফিরাত কামনায় এই জানাযার নামায আদায় করা জীবিতদের জন্য শরয়ী দায়িত্ব। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
গায়েবানা জানাযা
n حَقُّ الْـمُسْلِمِ عَلَى الْـمُسْلِمِ خَمْسٌ: رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ الْـمَرِيْضِ، وَاتِّبَاعُ الْـجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ
একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি হক রয়েছে, সালামের উত্তর দেওয়া, অসুস্থের খোঁজ-খবর নেয়া, জানাযায় অংশ গ্রহণ করা, দাওয়াত কবুল করা এবং হাঁচির জবাব দেওয়া।
[আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, খ. ২, পৃ. ৭১, হাদীস: ১২৪০]

অপর এক হাদীসে রয়েছে, হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন,
خَمْسٌ مَنْ عَمِلَهُنَّ فِي يَوْمٍ كَتَبَهُ اللهُ مِنْ أَهْلِ الْـجَنَّةِ: مَنْ عَادَ مَرِيْضًا، وَشَهِدَ جَنَازَةً، وَصَامَ يَوْمًا، وَرَاحَ يَوْمَ الْـجُمُعَةِ، وَأَعْتَقَ رَقَبَةً
পাঁচটি আমল এমন আছে, যে ব্যক্তি যে কোনো দিন ওই আমলগুলো করে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতবাসীদের অর্ন্তভুক্ত করে দেবেন; যে রোগীর খোঁজ-খবর নেবে, জানাযায় অংশগ্রহণ করবে, যে কোন দিন রোযা রাখবে, জুমুআর নামাযের জন্য প্রত্যুষে রওয়ানা করবে এবং একটি গোলাম আযাদ করবে।
[ইবনে হিব্বান, আস-সহীহ, মুআস্সিসাতুর রিসালা, বৈরুত,
লেবানন, খ. ৭, পৃ. ৬, হাদীস: ২৭৭১]
আরেক হাদীসে আছে,
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: ্রمَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلَّى عَلَيْهَا فَلَهُ قِيْرَاطٌ، وَمَنْ شَهِدَهَا حَتَّىٰ تُدْفَنَ فَلَهُ قِيرَاطَانِগ্ধ قِيْلَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَا الْقِيْرَاطَانِ؟ قَالَ: ্রمِثْلُ جَبَلَيْنِ عَظِيْمَيْنِ
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের জানাযায় অংশগ্রহণ করে জানাযার নামায আদায় করে তার জন্য রয়েছে এক কিরাত সাওয়াব। আর যে ব্যক্তি জানাযায় শরিক হয়ে দাফনকার্য সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকে তার জন্য রয়েছে দুই কিরাত সমপরিমাণ সাওয়াব। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!) দুই কিরাত বলতে কী বোঝানো হয়েছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দুটি বৃহৎ পাহাড়ের সমপরিমাণ সাওয়াব।
[আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, খ. ৭, পৃ. ৩৪৭, হাদীস: ৩০৭৮]
সাহাবি আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:
“مَا مِنْ رَجُلٍ مُسْلِمٍ يَمُوتُ فَيَقُومُ عَلَى جَنَازَتِهِ أَرْبَعُونَ رَجُلا لا يُشْرِكُونَ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلا شَفَّعَهُمُ اللَّهُ فِيهِ ”
“যদি কোন মুসলিম মৃত্যুবরণ করে, আর তার জানাযায় এমন চল্লিশ জন লোক উপস্থিত হয়, যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে না, আল্লাহ মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের সুপারিশ কবুল করবেন”। [মুসলিম ২০৭২]
তাই আলেমগণ বলেছেন, মুসল্লি যত বেশী হবে ততই মৃতের জন্যে কল্যাণ হবে, কারণ এতে সে অধিক মানুষের দু’আ পাবে।
শরিয়তের দৃষ্টিতে জানাযার নামায আদায় করা ফরজে কিফায়া। কোনো এলাকায় যদি কাউকে জানাযার নামায ছাড়া দাফন করে দেওয়া হয় তাহলে ওই এলাকার সবাই গুনাহগার হবে। জানাযার নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত রয়েছে। যেমন:
১. মৃত ব্যক্তিকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। কেননা কোনো অমুসলিম, কাফের, নাস্তিক-মুরতাদের জানাযার নামায পড়া জায়েয নয়।
২. ওই ব্যক্তিকে জীবিত জন্মগ্রহণ করতে হবে। কেননা মৃত নবজাতক বা মৃত ভ্রুণের জানাযার নামায পড়ার প্রয়োজন নেই।
৩. মৃত ব্যক্তির শরীর ও কাপড় প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরণের নাপাকি থেকে পবিত্র হতে হবে। সে পবিত্রতা গোসলের দ্বারা হোক বা তায়াম্মুমের দ্বারা হোক। সুতরাং কোনো মৃত ব্যক্তির স্বাভাবিকভাবে গোসল ও অপারগতাবশত তায়াম্মুম করানো ছাড়া জানাযার নামায পড়ালে তা শুদ্ধ হবে না। পবিত্র করানোর পর পুনরায় নামায পড়াতে হবে।
৪. মৃতের সতর আবৃত থাকতে হবে। অন্যথায় জানাযার নামায সহিহ হবে না। সুতরাং পুরুষ ও মহিলার জীবিতাবস্থায় যে পরিমাণ তার সতর হিসেবে গণ্য, সে পরিমাণ সতর ঢেকে রাখতে হবে। অন্যথায় তার জানাযার নামায শুদ্ধ হবে না।
৫. মৃতের লাশ ইমাম ও মুক্তাদিগণের সামনে থাকতে হবে। পাশে বা পিছনে থাকলে বা একেবারে অনুপস্থিত থাকলে জানাযা শুদ্ধ হবে না।
৬. মৃতের লাশ মাটিতে বা খাটিয়ার ওপর রাখতে হবে। কোনো ওজর ছাড়া মৃতের লাশ যানবাহনের ওপর বা মানুষের কাঁধের ওপর রেখে জানাযার নামায আদায় করলে তা শুদ্ধ হবে না।
৭. মৃতের লাশ অবশ্যই জানাযা স্থলে উপস্থিত থাকতে হবে। অনুপস্থিত লাশের ওপর জানাযা অর্থাৎ গায়েবানা জানাযা পড়া জায়েয নয়।
সম্প্রতি ল্য করা যাচ্ছে, আমাদের সমাজে যারা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে বা সহিংসতায় মারা যান, কর্মসূচি দিয়ে তাদের গায়েবানা জানাযা পড়া হয়। যেহেতু একজায়গায় একত্রিত হয়ে সবাই মিলে তার জানাযার নামায পড়া সম্ভব নয় সে কারণেই মৃত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার গায়েবানা জানাযা পড়া হয়ে থাকে। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যায় বড় কোনো নেতা বা ব্যক্তি মারা গেলে তার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মান থাকার কারণে তার জানাযার নামায পড়তে আগ্রহ বোধ করে। এসব েেত্র মানুষ সাধারণত গায়েবানা জানাযার আশ্রয় নিয়ে থাকে। কিন্তু গায়েবানা জানাযা জায়েয কিনা এ বিষয়টিকে কেউ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেন না। যেহেতু জানাযার নামায একটি ইবাদত ও ধর্মীয় বিষয় তাই ধর্মীয় শর্তাবলী ও বিধি-বিধান মেনেই তা পালন করা উচিত। দুঃখের বিষয় হলো, সম্প্রতি জানাযার বিধি-বিধানকে চরম উপো করে এই মহান ইবাদতটিকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেয়া হয়েছে, যা কিছুতেই কাম্য নয়।
হানাফী, মালিকী মাযহাবের সব ফকিহ ও হাম্বলী মাযহাবের ফকিহদের একাংশের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, লাশ অনুপস্থিত রেখে গায়েবানা জানাযা জায়েয নয়। কেননা সাহাবায়ে কেরামের যুগের দিকে ল করলে দেখা যায় যে, সে যুগে গায়েবানা জানাযা পড়ার কোনো প্রচলন ছিল না। অথচ সে যুগেও বড় বড় সাহাবি দূর-দূরান্তে ইন্তেকাল করেছিলেন; কিন্তু তাদের গায়েবানা জানাযা পড়া হয়নি। যেমন বীরে-মাউনার ঘটনায় সত্তরজন কারী আলেম সাহাবির শাহাদাতের খবর জেনেও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েবানা জানাযা পড়েননি। এমনকি স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের পরও কোথাও কোনো সাহাবি এমনকি মক্কা শরিফ যা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মস্থান সেখানেও কোনো গায়েবানা জানাযা পড়া হয়নি। আর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো কাজ ব্যাপকভাবে বর্জন করা তা বর্জনীয় হওয়ার প্রমাণ।
হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী ঊলামায়ে কেরামদের মতে জানাযার নামাযে মৃত ব্যাক্তির সামনে থাকা জরুরি নতুবা গায়েবানা জানাযা পড়া যাবেনা আর গায়েবানা জানাযা সুন্নাহসম্মত নয়।
[বাহরুর রায়েক; ফতোয়ায়ে শামী; আহকামুল মাইয়েত; যাদুল মা’আদ- বাবে সলাতুল জানায়েয; আল মাজমূ’-৫/২৫৩; আল মুগনী ২/৩৮৬; যারকানী ২/১০; ইলাউস সুনান ২/২৩৪; ফয়দুল বারী ২/৪৬৯; মুগনী মুহতাজ ১/১৬৫; কাশফুল কান্না ২/১২৬; শরহুছ ছগীর ১/৫৬৯]
হাম্বলী মাযহাবের অন্যতম দাবীদার ইবনুল কায়্যিম বলেন,
وَلَـمْ يَكُنْ مِنْ هَدْيِهِ وَسُنَّتِهِ الصَّلَاةُ عَلَىٰ كُلِّ مَيِّتٍ غَائِبٍ فَقَدْ مَاتَ خَلْقٌ كَثِيْرٌ مِنَ الْـمُسْلِمِيْنَ وَهُمْ غُيَّبٌ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْهِمْ.
“গায়েবানা জানাযা পড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত পরিপন্থি। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় দূর-দূরান্তে বহু সাহাবায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেছেন; কিন্তু তিনি তাদের গায়েবানা জানাযা পড়েননি।’’
[(ক) আল-আযীমাবাদী, আওনুল মা’বুদ শরহু সুনানি আবী দাউদ, দারু আল-কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, লেবানন (দ্বিতীয় সংস্করণ: ১৪১৫ হি. = ১৯৯৪ খ্রি.), খ. ৯, পৃ. ৮; (খ)) ইবনে কাইয়িম আল-জওযিয়া, যাদুল মা‘আদ ফী হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, মুআস্সিসা আর-রিসালা, বৈরুত, লেবানন (সপ্তদশ সংস্করণ: ১৪১৫ হি. = ১৯৯৪ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৫০০]
হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠতম ভাষ্যকার আল্লামা ইবনুল হুমাম রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন,
وَشَرْطُ صِحَّتِهَا إسْلَامُ الْـمَيِّتِ وَطَهَارَتُهُ وَوَضْعُهُ أَمَامِ الْـمُصَلِّيْ، فَلِهَذَا الْقَيْدِ لَا تَجُوزُ عَلَىٰ غَائِبٍ وَلَا حَاضِرٍ مَحْمُوْلٍ عَلَىٰ دَابَّةٍ أَوْ غَيْرِهَا، وَلَا مَوْضُوْعٍ مُّتَقَدِّمٍ عَلَيْهِ الْـمُصَلِّيْ، وَهُوَ كَالْإِمَامِ مِنْ وَجْهٍ.
‘জানাযা সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মৃতকে মুসলমান হতে হবে, পবিত্র হতে হবে এবং লাশ মুসল্লিদের সামনে রাখতে হবে। কাজেই অনুপস্থিত লাশের ওপর গায়েবানা জানাযা জায়েয নয়।
[ইবনুল হুমাম, ফতহুল কদীর শরহুল হিদায়া, দারুল ফিকর, বৈরুত, লেবানন, খ. ২, পৃ. ১১৭]
এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, লাশ ছাড়া জানাযা তথা গায়েবানা জানাযা পড়া জায়েয নয়। ফাতহুল কদীরেরই অন্য জায়গায় তিনি আরও বলেন,
ثُمَّ دَلِيْلُ الْـخُصُوْصِيَّةِ أَنَّهُ لَـمْ يُصَلِّ عَلَىٰ غَائِبٍ إلَّا عَلَىٰ هَؤُلَاءِ وَمَنْ سِوَى النَّجَاشِيِّ صَرَّحَ فِيْهِ بِأَنَّهُ رُفِعَ لَهُ وَكَانَ بِمَرْأًى مِنْهُ مَعَ أَنَّهُ قَدْ تُوُفِّيَ خَلْقٌ مِنْهُمْ غَيْبًا فِي الْأَسْفَارِ كَأَرْضِ الْـحَبَشَةِ وَالْغَزَوَاتِ وَمِنْ أَعَزِّ النَّاسِ عَلَيْهِ كَانَ الْقُرَّاءُ، وَلَـمْ يُؤْثَرْ قَطُّ عَنْهُ بِأَنَّهُ صَلَّىٰ عَلَيْهِمْ وَكَانَ عَلَى الصَّلَاةِ عَلَىٰ كُلِّ مَنْ تُوُفِّيَ مِنْ أَصْحَابِهِ حَرِيْصًا حَتَّىٰ قَالَ: ্রلَا يَمُوتَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ إلَّا آذَنْتُمُوْنِيْ بِهِ، فَإِنَّ صَلَاتِيْ عَلَيْهِ رَحْمَةٌ لَهُগ্ধ عَلَىٰ مَا سَنَذْكُرُ.
‘বহু সাহাবায়ে কেরাম এমন রয়েছেন, যারা বিভিন্ন সফরে মদিনার বাইরে ইন্তেকাল করেন। যেমন সিরিয়া বা বিভিন্ন যুদ্ধেেত্র। এক বীরে মাউনার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডেই শহীদ হয়েছেন সত্তরজন সাহাবী। যারা ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র; কিন্তু তিনি তাদের কারো গায়েবানা জানাযা পড়েছেন বলে একটি বর্ণনাও পাওয়া যায় না। অথচ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের জানাযায় শরীক হতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। যে কারণে তিনি বলে রাখতেন, তোমাদের মধ্যে কারো ইন্তেকাল হলে আমাকে সংবাদ দেবে। যাতে আমি তার জানাযা পড়তে পারি। কারণ আমি যার জানাযায় শরীক হবো তা তার জন্য রহমতের কারণ হবে।
[ইবনুল হুমাম, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১১৮]
আল্লামা কাসানী (রহ.) বলেন, وَعَلَىٰ هَذَا قَالَ أَصْحَابُنَا: لَا يُصَلَّىْ عَلَىٰ مَيِّتٍ غَائِبٍ “এজন্যই আমাদের ওলামাগণ বলেছেন, অনুপস্থিত লাশের ওপর জানাযা তথা গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে না।
[আল-কাসানী, বাদায়িউস সানাই ফী তারতীবিশ শারায়ি,
দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, লেবানন, খ. ১, পৃ. ৩১২]
বিখ্যাত ফাতওয়া গ্রন্থ আদ-দুররুল মুখতারে বলা হয়েছে,
حُضُوْرُهُ (وَوَضْعُهُ) وَكَوْنُهُ هُوَ أَوْ أَكْثَرُهُ (أَمَامَ الْـمُصَلِّيْ) وَكَوْنُهُ لِلْقِبْلَةِ فَلَا تَصِحُّ عَلَىٰ غَائِبٍ.
জানাযা সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মৃতের লাশ মুসল্লিদের সম্মুখে উপস্থিত থাকা। কাজেই গায়েব বা অনুপস্থিত লাশের ওপর জানাযা জায়েয নয়।
[আল-হাসকফী, আদ-দুররুল মুখতার তানওয়ীরুল আবসার ওয়া জামিউল বিহার, দারুল ফিকর, বয়রুত, লেবনান, খ. ২, পৃ. ২০৯]
মোটকথা হানাফী ও মালিকী মাযহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত অভিমত এবং হাম্বলী মাযহাবের অধিকাংশ ইমামের অভিমত হলো, গায়েবানা জানাযা জায়েয নয়। জানাযা পড়তে হলে অবশ্যই লাশ মুসল্লিদের সামনে উপস্থিত থাকতে হবে।
কেউ কেউ গায়েবানা জানাযা জায়েয বলতে চান। তারা দলিল হিসেবে ইথিওপিয়ার মুসলিম বাদশাহ হজরত নাজ্জাসীর ঘটনা এবং মুয়াবিয়া ইবনে মুয়াবিয়া আল-মুযানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর ঘটনা পেশ করেন।
নাজ্জাসীর জানাযার ঘটনা
গায়েবানা জানাযার জন্য হাবশার (আবিসিনিয়া) বাদশাহ আছহামা নাজ্জাশীর জানাযা আদায়ের ঘটনাই হ’ল একমাত্র দলীল, যিনি ৯ম হিজরিতে মারা যান। নাজ্জাশী খ্রিস্টানদের বাদশাহ ছিলেন। কিন্তু নিজে মুসলমান ছিলেন। সেকারণে তার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নিয়ে জামা‘আত সহকারে জানাযা আদায় করেন এবং ইরশাদ করেন, صَلُّوْا عَلَى أَخٍ لَّكُمْ مَاتَ بِغَيْرِ أَرْضِكُمْ ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জানাযা পড়। যিনি তোমাদের দেশ ব্যতীত অন্য দেশে মৃত্যুবরণ করেছেন’।
নাজ্জাসীর জানাযার ঘটনাটি সহীহ ইবনে হিব্বানে এভাবে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ، قَالَ: أَنْبَأَنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، أَنَّ أَخَاكُمْ النَّجَاشِيَّ تُوُفِّيَ، فَقُومُوْا فَصَلُّوْا عَلَيْهِ، فَقَامَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، وَصَفُّوْا خَلْفَهُ، وَكَبَّرَ أَرْبَعًا وَهُمْ لَا يَظُنُّوْنَ إِلَّا أَنَّ جَنَازَتَهُ بَيْنَ يَدَيْهِ
ইমরান ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের ভাই নাজ্জাশী ইন্তিকাল করেছেন। চলো তাঁর জানাযার নামায পড়ি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে বাইরে এলেন। সাহাবায়ে কেরাম তার পেছনে কাতারবন্দি হলেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার তাকবীরের সাথে নামায পড়ালেন। সাহাবায়ে কেরামের ধারণা নাজ্জাশীর জানাযা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখা ছিলো।
[ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, দারু ইয়াহইয়ায়িল কুতুব আল-আরাবিয়া, বয়রুত, লেবনান, খ. ১, পৃ. ৪৯১, হাদীস: ১৫৩৭]
সহিহ আল-বুখারীতে ঘটনার বিবরণ এভাবে রয়েছে,
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: ্রنَعَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِلَىٰ أَصْحَابِهِ النَّجَاشِيَّ، ثُمَّ تَقَدَّمَ، فَصَفُّوْا خَلْفَهُ، فَكَبَّرَ أَرْبَعًا
হজরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবায়ে কেরামের কাছে উপস্থিত হয়ে নাজ্জাসীর মৃত্যুসংবাদ শোনালেন এবং জানাযার নামায পড়ার জন্য সামনে অগ্রসর হলেন। সাহাবায়ে কেরাম তার পেছনে কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়ালেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার তাকবীর দিলেন।
[আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, খ. ২, পৃ. ৮৬, হাদীস: ১৩১৮]
সহীহ আল-বুখারীর অন্য বর্ণনায় হজরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত আছে,
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم حِيْنَ مَاتَ النَّجَاشِيُّ: ্রمَاتَ اليَوْمَ رَجُلٌ صَالِحٌ، فَقُوْمُوْا فَصَلُّوْا عَلَىٰ أَخِيكُمْ أَصْحَمَةَ
একদিন নবী করীম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাবশার অধিবাসী একজন নেককার লোক মারা গেছেন। তোমরা তোমাদের ভাই ‘আছমাহা’(নাজ্জাসী) এর জানাযা পড়ার জন্য প্রস্তুত হও।
[আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, খ. ৫, পৃ. ৫১, হাদীস: ৩৮৭৭]
ইবনে মাজাহ শরীফে ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ أَسِيْدٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ بِهِمْ فَقَالَ: ্রصَلُّوْا عَلَىٰ أَخٍ لَكُمْ مَاتَ بِغَيْرِ أَرْضِكُمْগ্ধ قَالُوْا: مَنْ هُوَ؟ قَالَ: ্রالنَّجَاشِيُّ
হুযায়ফা ইবনে আসীদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে বের হলেন। তিনি বললেন, তোমরা অমুসলিম দেশে ইন্তিকালকারী তোমাদের এক ভাইয়ের জানাযা পড়। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি নাজ্জাসী।
[ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, দারু ইয়াহইয়ায়িল কুতুব আল-আরাবিয়া, বয়রুত, লেবনান, খ. ১, পৃ. ৪৯১, হাদীস: ১৫৩৭]
উপর্যুক্ত হাদীসসমূহসহ সিহাহ সিত্তায় বর্ণিত অন্যান্য হাদীস দ্বারা বোঝা যায় হাবশার অধিপতি নাজ্জাসী স্বদেশে ইন্তিকাল করেছেন আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বস্থানে সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে জানাযার নামায পড়েছেন। গায়েবানা জানাযার পক্ষে কেউ কেউ এ ঘটনাকে দলিল হিসাবে পেশ করেন।
মুয়াবিয়া ইবনে মুয়াবিয়া আল-মুযানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর গায়েবানা জানাযার ঘটনা:
হযরত মুয়াবিয়া ইবনে মুয়াবিয়া আল-মুযানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর গায়েবানা জানাযার ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ইমাম তাবারানী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তার আল-মুজামুল কাবীর গ্রন্থে হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: نَزَلَ جِبْرِيْلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، فَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ! مَاتَ مُعَاوِيَةُ بْنُ مُعَاوِيَةَ الْـمُزَنِيُّ، أَتُحِبُّ أَنْ تُصَلِّيَ عَلَيْهِ؟ قَالَ: ্রنَعَمْগ্ধ ، فَضَرَبَ بِجَنَاحَيْهِ فَلَمْ تَبْقَ شَجَرَةٌ، وَلَا أَكَمَةٌ إِلَّا تَضَعْضَعَتْ، وَرَفَعَ لَهُ سَرِيْرَهُ حَتَّىٰ نَظَرَ إِلَيْهِ، فَصَلَّىٰ عَلَيْهِ وَخَلْفَهُ صَفَّانِ مِنَ الْـمَلَائِكَةِ فِيْ كُلِّ صَفٍّ سَبْعُوْنَ أَلْفًا، فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لِـجِبْرِيْلَ: ্রيَا جِبْرِيْلُ! مَا بَلَّغَ هَذَا هَذِهِ الْـمَنْزِلَةَ مِنَ اللهِ؟গ্ধ قَالَ: بِحُبِّهِ “قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ” وَقِرَاءَتِهِ إِيَّاهَا جَائِيًا وَذَاهِبًا وَقَائِمًا وَقَاعِدًا وَعَلَىٰ كُلِّ حَالٍ.
হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেন, একদিন জিবরাইল আলায়হিস্ সালাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহ তাআলার রাসুল! মুআবিয় ইবনে মুআবিয়া আল-মুযানী ইন্তেকাল করেছেন। আপনি তার নামাযে জানাযা পড়তে আগ্রহী? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই। তখন জিবরাইল আলায়হিস্ সালাম তার উভয় ডানা দ্বারা জমিনে আঘাত করলেন। ফলে জমিনের সকল গাছ-পালা টিলা-টুম্বর সমান হয়ে গেল। অতঃপর মুআবিয়ার লাশ সামনে আনা হলো। যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামায পড়ালেন। পেছনে দু’কাতার ফেরেশতা দাঁড়ালেন। প্রতি কাতারে সত্তর হাজার করে ফেরেশতা ছিল। নামায শেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাইল আলায়হিস্ সালামকে জিজ্ঞাসা করলেন। কোন আমলের বরকতে মুআবিয়া এই মর্যাদা লাভ করল। উত্তরে হযরত জিবরাইল আলায়হিস্ সালাম বললেন, মুআবিয়া সুরা ইখলাসকে খুবই মুহাব্বত করতেন এবং চলতে ফিরতে উঠতে বসতে সর্বাবস্থায় তিনি সুরা আল-ইখলাস তেলাওয়াত করতেন।
[আত-তাবারানী, আল-মু’জামুল কবীর, মাকতাবাতু ইবনে তায়মিয়া,
কায়রো, মিসর, খ. ১৯, পৃ. ৪২৮, হাদীস: ১০৪০]
এই ঘটনা দ্বারাও অনেকে বুঝাতে চান যে, গায়েবানা জানাযা পড়া বৈধ।
নাজ্জাসীর জানাযা সম্পর্কে উত্তর
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজ্জাসীর গায়েবানা জানাযা পড়েছেন বলে যে দাবি করা হয়েছে তা এই হাদীস দ্বারা বোঝা যায় না; বরং হাদীস দ্বারা যেটা বোঝা যায় সেটা হলো, নাজ্জাসীর লাশ মুজিযা-স্বরূপ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে নিয়ে আসা হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরামও এই মনে করে জানাযার নামায পড়েছেন যে, লাশ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে আছে। যেমন সহীহ সনদে মুসনদে আহমদ ইবনে হাম্বলে বর্ণিত হয়েছে,
حَدَّثَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ، حَدَّثَنَا حَرْبٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَىٰ، أَنَّ أَبَا قِلَابَةَ حَدَّثَهُ، أَنَّ أَبَا الْـمُهَلَّبِ حَدَّثَهُ، أَنَّ عِمْرَانَ بْنَ حُصَيْنٍ حَدَّثَهُ، أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: ্রإِنَّ أَخَاكُمْ النَّجَاشِيَّ تُوُفِّيَ فَصَلُّوْا عَلَيْهِগ্ধ، قَالَ: فَصَفَّ رَسُوْلُ اللَهِ صلى الله عليه وسلم، وَصَفَفْنَا خَلْفَهُ فَصَلَّىٰ عَلَيْهِ، وَمَا نَحْسِبُ الْـجِنَازَةَ إِلَّا مَوْضُوْعَةً بَيْنَ يَدَيْهِ.)إسناده صحيح علىٰ شرط مسلم رجاله ثقات رجال الشيخين غير أبي المهلب الجرمي فمن رجال مسلم.(
হজরত ইমরান ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের ভাই নাজ্জাসী ইন্তেকাল করেছেন। সুতরাং তোমরা তার জানাযা পড়।’ বর্ণনাকরী বলেন, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাতার সোজা করে দাঁড়ালেন। আমরাও তার পেছনে কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের ধারণা হচ্ছিল লাশটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখা হয়েছিল।
[আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, মুআস্সিসাতুর রিসালা,
বৈরুত, লেবানন, খ. ৩৩, পৃ. ২০৯, হাদীস: ২০০০৫]
বিষয়টি সহীহ ইবনে হিব্বানেও সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে,
عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ، قَالَ: ্রأَنْبَأَنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، أَنَّ أَخَاكُمْ النَّجَاشِيَّ تُوُفِّيَ، فَقُوْمُوْا فَصَلُّوْا عَلَيْهِ، فَقَامَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، وَصَفُّوا خَلْفَهُ، وَكَبَّرَ أَرْبَعًا وَهُمْ لَا يَظُنُّوْنَ إِلَّا أَنَّ جَنَازَتَهُ بَيْنَ يَدَيْهِ
সাহাবায়ে কেরাম প্রবলভাবে ধারণা করেন যে, লাশটি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখা হয়েছে।
[ইবনে হিব্বান, আস-সহীহ, মুআস্সিসাতুর রিসালা,
বয়রুত, লেবনান, খ. ৭, পৃ. ৩৬৯, হাদীস: ৩১০২]
عن ابن عباس قال : ( كشف للنبي صلى الله عليه وآله وسلم عن سرير النجاشي حتى رآه وصلى عليه -) سنن الترمذي গ্ধ كتاب الجنائز عن رسول الله صلى الله عليه وسلم গ্ধ باب ما جاء في صلاة النبي صلى الله عليه وسلم على النجاشي (
হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, নাজ্জাসীর খাটিয়াকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখা হয়েছিল। ফলে তিনি তাকে দেখে দেখে জানাযা আদায় করেছিলেন।
[তুহফাতুল আহওয়াযী-১০৩৯]
বিষয়টি নাসবুর রায়া গ্রন্থেও বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। এখানে তা হুবহু উল্লেখ করা হলো:
النَّوْعُ الْـحَادِي وَالْأَرْبَعِيْنَ، مِنْ الْقِسْمِ الْـخَامِسِ، مِنْ حَدِيْثِ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم، قَالَ: إِنَّ أَخَاكُمْ النَّجَاشِيَّ تُوُفِّيَ، فَقُوْمُوْا صَلُّوْا عَلَيْهِ، فَقَامَ رَسُوْلُ اللَهِ صلى الله عليه وسلم، وَصَفُّوْا خَلْفَهُ، فَكَبَّرَ أَرْبَعًا، وَهُمْ لَا يَظُنُّوْنَ إلَّا أَنَّ جِنَازَتَهُ بَيْنَ يَدَيْهِ.
الثَّانِيْ: أَنَّهُ مِنْ بَابِ الضَّرُورَةِ لِأَنَّهُ مَاتَ بِأَرْضٍ لَّـمْ يُقَمْ فِيْهَا عَلَيْهِ فَرِيْضَةُ الصَّلَاةِ، فَتَعَيَّنَ فَرْضُ الصَّلَاةِ عَلَيْهِ لِعَدَمِ مَنْ يُصَلِّيْ عَلَيْهِ ثَمَّ، وَيَدُلُّ عَلَىٰ ذَلِكَ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم لَـمْ يُصَلِّ عَلَىٰ غَائِبٍ غَيْرِهِ، وَقَدْ مَاتَ مِنْ الصَّحَابَةِ خَلْقٌ كَثِيْرٌ، وَهُمْ غَائِبُوْنَ عَنْهُ، وَسَمِعَ بِهِمْ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْهِمْ، إلَّا غَائِبًا وَاحِدًا وَرَدَ أَنَّهُ طُوِيَتْ لَهُ الْأَرْضُ حَتَّىٰ حَضَرَهُ، وَهُوَ مُعَاوِيَةُ بْنُ مُعَاوِيَةَ الْـمُزَنِيّ، رَوَى حَدِيْثَهُ الطَّبَرَانِيُّ فِيْ ্রمُعْجَمِهِ الْوَسَطِগ্ধ. و্َরكِتَابِ مُسْنَدِ الشَّامِيِّينَগ্ধ حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ سَعِيدٍ الرَّازِيُّ ثَنَا نُوحُ بْنُ عَمْرِو بْنِ حُوَيٍّ السَّكْسَكُ ثَنَا بَقِيَّةُ بْنُ الْوَلِيدِ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ زِيَادٍ الْأَلْـهَانِيِّ عَنْ أَبِيْ أُمَامَةَ، قَالَ: كُنَّا مَعَ رَسُوْلِ اللَهِ صلى الله عليه وسلم بِتَبُوْكَ، فنزل عليه جبرئيل، فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! إنَّ مُعَاوِيَةَ بْنَ مُعَاوِيَةَ الْـمُزَنِيّৃ
[আয-যায়লায়ী, নসবুর রায়া লি আহাদীসিল হিদায়া, দারুর রাইয়ান লিত-তাবাআতি ওয়ান নশর, বয়রুত, লেবনান ও দারুল কিবলা লিস-সাকাফাতিল ইসলামিয়া, জিদ্দা, সাঊদী আরব (প্রথম সংস্করণ: ১৪১৮ হি. = ১৯৯৭ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ২৮৩]
আল্লামা ইবনে হাজার আল-আসকালানী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল বারীতে ইয়াহইয়া ইবনে কসীরের বর্ণনা উল্লেখ করার পর লিখেন, আমরা নাজ্জাসীর জানাযা পড়েছি এই অবস্থায় যে, তার মৃতদেহ আমাদের সামনে উপস্থিত ছিল।’
وَلِابْنِ حِبَّانَ مِنْ حَدِيْثِ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ، فَقَامَ وَصَفُّوْا خَلْفَهُ وَهُمْ لَا يَظُنُّوْنَ إِلَّا أَنَّ جِنَازَتَهُ بَيْنَ يَدَيْهِ أَخْرَجَهُ مِنْ طَرِيْقِ الْأَوْزَاعِيِّ، عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِيْ كَثِيْرٍ، عَنْ أَبِيْ قِلَابَةَ، عَنْ أَبِي الْـمُهَلَّبِ عَنْهُ وَلِأَبِيْ عَوَانَةَ مِنْ طَرِيْقِ أَبَانَ وَغَيْرِهِ، عَنْ يَحْيَىٰ فَصَلَّيْنَا خَلْفَهُ وَنَحْنُ لَا نَرَى إِلَّا أَنَّ الْـجِنَازَةَ قُدَّامَنَا وَمِنَ الِاعْتِذَارَاتِ أَيْضًا أَنَّ ذَلِكَ خَاصٌّ بِالنَّجَاشِيِّ، لِأَنَّهُ لَـمْ يَثْبُتْ أَنَّهُ صلى الله عليه وسلم صَلَّىٰ عَلَىٰ مَيِّتٍ غَائِبٍ غَيْرِهِ، قَالَ الْـمُهَلَّبُ وَكَأَنَّهُ لَـمْ يَثْبُتْ عِنْدَهُ قِصَّةُ مُعَاوِيَةَ اللَّيْثِيِّ.
উপর্যুক্ত বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায় যে, নাজ্জাসীর নামাযে জানাযা গায়েবানা ছিল না, বরং নাজ্জাসীর লাশ মদীনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস